সবুজ মনের রসদ
Ichchhamoti Logo

অনেক দিন, অনেক বছর পর তোমার সাথে কথা হচ্ছে। শেষ যখন গল্প করেছিলাম তখন তুমিও অনেকটা ছোট ছিলে আর আমাদের পৃথিবীটাতেও অনেক কিছু অন্য রকম ছিল। গত কয়েক বছরে খুব দ্রুত কিছু পরিবর্তন হল আর হয়ে চলেছে। পরিবর্তন গুলো এত তাড়াতাড়ি হচ্ছে, যে অনেক কিছু কী কারণে হচ্ছে, তার ভাল খারাপ দিকগুলো, তাতে কার লাভ বা ক্ষতি হচ্ছে, এগুলো বোঝার আগেই আরও কিছু পাল্টে যাচ্ছে। এতদিনে এ.আই. বা আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স, মেশিন লার্নিং, অটোমেশন - এই শব্দগুলোর কয়েকটার সাথে নিশ্চয়ই পরিচয় হয়েছে আর স্কুলে হয়তো তার কিছু নিয়ে পড়াশোনাও করতে হচ্ছে। কিন্তু ঐ যে বললাম, এত তাড়াতাড়ি এই বিষয়গুলো বদলে যাচ্ছে আর তার সাথে আমাদের জীবনের অনেক কিছু, যে বড়রাও ঠিকমত বুঝে উঠতে পারছে না। বলতে গেলে, সবাই একটা দ্রুতগামী ট্রেনে উঠে পড়ার জন্য দৌঁড়চ্ছে, অনেক সময় ট্রেনের গন্তব্য কোথায় তা না জেনেই। না উঠলে যেন কিছু একটা কমতি পড়ে যাবে, পিছিয়ে পড়তে হবে, বা তার থেকেও বেশী গ্রাস করবে একটা অনিশ্চয়তা। তোমাকেও না জেনেই, ইচ্ছে না থাকলেও যেতে হচ্ছে। তাই মনে হল, যেহেতু এই পৃথিবীটার ভবিষ্যতটা তোমাদের, আর সেটার দায়িত্বও এক সময় তোমার হাতেই আসবে, তাই এই পরিবর্তনগুলো নিয়ে তোমার সাথে গল্প করি - ট্রেনটায় উঠে পড়ার আগে এক মুহূর্ত দাঁড়িয়ে ট্রেনটা কোথায় যাচ্ছে, কেন যাচ্ছে সেটা নিয়ে একটু খোঁজখবর করি। তুমি আরেকটু সচেতন হয়ে হয়তো বড়দেরকেও আরেকটু সচেতন করতে পারবে। অনেক সময় তাদেরও তো অনেক কিছু শেখার থাকে তোমাদের থেকে।

এ.আই. , ডাটা সেন্টার - এগুলো নিয়ে গল্প করব, অনেক গল্প করারও আছে। কিন্তু তার আগে আজ আরেকটা গল্প বলব। সত্যিকারের গল্প - অনেকদিন আগের কথা।

১৭৬৯ সালের কথা। ইউরোপের মানচিত্রটা তখন অনেকটাই আলাদা। আজকের দিনের অস্ট্রিয়া, হাঙ্গেরি সহ পূর্ব ইউরোপের অনেকটাই হাবসবুর্গ রাজত্বের শাসনে। তার সম্রাজ্ঞী মারিয়া টেরেসা - তার দরবারে তখন জ্ঞানীগুণীদের আমন্ত্রণ করা হত বিশেষ বিষয়ে তাদের দক্ষতা প্রদর্শনের জন্য। এক ফরাসী যাদুকর ফ্রাশোয়াঁ পেয়েটিরকে (François Pelletier) এরকম এক সভায় তার যাদু প্রদর্শনের জন্য আমন্ত্রন করা হয়েছিল। অনেক নিমন্ত্রিত দর্শকদের মধ্যে একজন ছিলেন হাঙ্গেরিয়ান উলফগ্যাং ফন কেমপেলেন (Wolfgang von Kempelen)। তিনি ছিলেন সেই সময়ের এক নামকরা ইঞ্জিনিয়ার এবং আবিষ্কারক। দর্শকদের মধ্যে বসে তাঁর অলিখিত কাজ ছিল পেয়েটিয়েরের যাদুকর্মের কলাকৌশল আর তার বিজ্ঞানসম্মত ব্যাখ্যা সম্রাজ্ঞীকে বলা। সভা হাততালিতে ফেটে পড়লেও অভিভূত হলেন না ফন কেমপেলেন। তিনি মারিয়া টেরেসাকে বললেন যে এর থেকে অনেক বেশী চিত্তাকর্ষক প্রদর্শনী তিনি করতে পারেন - এবং কোন যাদুকৌশল বা ছলচাতুরী নয়, শুধুমাত্র বিজ্ঞান আর প্রযুক্তির সাহায্যে। সম্রাজ্ঞী ৬ মাস সময় দিলেন ফন কেমপেলেনকে তার প্রতিশ্রুতি পূরণ করার জন্য।

উলফগ্যাং ফন কেমপেলেন পড়াশোনা করেছিলেন প্রধানতঃ আইন আর দর্শন নিয়ে, পেশায় ছিলেন সরকারী কর্মচারী, কিন্তু তার বিশেষ প্রেম ছিল বিজ্ঞান আর প্রযুক্তির বিষয়ে। নিজের দেওয়া প্রতিশ্রুতি পূরণ করে ফন কেমপেলেন ১৭৭০ সালে ফিরে এলেন এমন এক যন্ত্র নিয়ে যা চমক লাগিয়ে দিল সবাইকে - অভিভূত করল সম্রাজ্ঞী আর দর্শকদের। এক কাঠের তৈরী যন্ত্র যা দাবা খেলতে পারে, তার নাম হয়ে গেল ‘মেকানিকাল টার্ক’। কিভাবে এই নাম হল সেটা একটু পরেই বলছি। অষ্টাদশ শতকের সেই সময়ে যন্ত্রের স্বয়ংক্রিয়তা নিয়ে ইউরোপে অন্তহীন উৎসাহ। ইউরোপের সাম্রাজ্যবাদী শক্তিগুলোর তখন এশিয়া, আফ্রিকা, আমেরিকা জুড়ে উপনিবেশ। সেখানকার মানুষের সস্তার শ্রম, ক্রীতদাসদের শ্রম, আর কেড়ে নেওয়া সম্পদের দৌলতে ইউরোপের পুঁজিবাদদের হাতে অফুরন্ত মূলধন। তাদের সাথে শাসক শ্রেণী একত্রিত হয়ে তখন একে অপরের সাথে পাল্লা দিচ্ছে - উৎসাহ আর অনুপ্রেরণা দিচ্ছে তাদের বৈজ্ঞানিক আর প্রযুক্তিবিদদের, কিভাবে যান্ত্রিক স্বয়ংক্রিয়তা মানুষের দৈনন্দিন জীবনে ঢোকানো যায়। একে একে আসতে থাকল মানুষ বা জীবজন্তুর মত অঙ্গপ্রত্যঙ্গ নাড়তে পারে, কথা বলতে বা গান গাইতে পারে এরকম যন্ত্র। কিন্তু উলফগ্যাং ফন কেমপেলেনের যন্ত্রের বৈশিষ্ট্য হল - শুধু মাত্র মানুষের শারীরিক অনুকরণ নয়, দাবার মত খেলা যাতে চিন্তাভাবনা আর বুদ্ধির প্রয়োজন তার অনুকরণ করা।

যন্ত্রটা ছিল একটা কাঠের তৈরি ক্যাবিনেট - যার সামনে রয়েছে কয়েকটি দরজা। সেগুলো খুলে ভিতরের কলকব্জা আর আরও অনেক জটিল যন্ত্র দেখা যায়। যন্ত্রের উপরটা সমতল, টেবিলের মত আর উপরেই দাবার বোর্ডের খোপ কাটা। তার পিছনে টেবিলের দিকে চেয়ে বসে আছে এক মানুষের আকৃতির কাঠের পুতুল। তার পোশাক ওটোমানদের মত আর মাথাতেও তাদের মত একটা পাগড়ি। তুরস্ক বা টার্কির মানুষরা সেই সময়ে ওটোমান নামেও পরিচিত ছিল। টার্কি আর যান্ত্রিক - এই দুই মিলিয়েই হয়ত লোকমুখে এই চমকপ্রদ নতুন আবিষ্কারের নাম হয়ে গেল ‘মেকানিকাল টার্ক’। প্রাচ্যের মানুষের জীবনধারা নিয়ে পাশ্চাত্যে মানুষের মনে যে রহস্য বা ধাঁধা, সেগুলো থেকেই কি ফন কেমপেলেন বেছে নিয়েছিলেন তার যন্ত্রের এরকম সাজসজ্জা - হয়তো!

এই যান্ত্রিক দাবাড়ু, যাকে আমরা ‘মেকানিকাল টার্ক’ বলেই ডাকব, তার বাঁ হাতে ধরা একটা লম্বা পাইপ - যেন এই যান্ত্রিক মানব ধূমপানেও শৌখিন - আর তার ডান হাত রাখা সামনে দাবার বোর্ডের টেবিলের উপরে। সন্দেহভাজন আর খুঁতখুঁতে মানুষের মন শান্ত করার জন্য একে একে সামনের দরকজাগুলো খুলে দেখালেন ফন কেমপেলেন। পুঙ্খানুপুঙ্খ ভাবে যন্ত্র পরিদর্শনের পর নিচের ড্রয়ার থেকে দাবার গুটি বের করে সাজালেন বোর্ডের উপর আর সগর্বে ঘোষণা করলেন যে ‘মেকানিকাল টার্ক’ খেলার জন্য প্রস্তুত। দর্শকদের মধ্যে থেকে তিনি আমন্ত্রণ করলেন একজন স্বেচ্ছাসেবককে। ফন কেমপেলেন একটা লিভার দিয়ে ঘড়ির স্প্রিং এর মত একটা চাবি ঘুরিয়ে দিতেই প্রাণ চলে এল মেকানিকাল টার্কের দেহে। তার দৃষ্টি আবদ্ধ হল দাবার বোর্ডে আর মাথা দুলতে লাগল এদিক থেকে ওদিকে - ভাবনার তালে। বিস্মিত, হতবাক দর্শক নিঃশব্দে দেখল এই যান্ত্রিক দাবাড়ুকে। প্রচণ্ড আত্মবিশ্বাস আর আক্রমণাত্মক ভঙ্গিতে খেলে মেকানিকাল টার্ক সহজেই জিতে গেল তার প্রথম প্রতিপক্ষের বিপক্ষে।

নিজের এই আবিষ্কার এবারে মাথাব্যথার কারণ হয়ে উঠল ফন কেমপেলেনের। মারিয়া টেরেসা খুশি আর হতবাক হওয়ার থেকেও বেশী বুঝলেন এই এক সুযোগ তার দরবারকে ইউরোপের আকর্ষণের মূলকেন্দ্র করে তোলার। তিনি বাড়িয়ে দিলেন ফন কেমপেলেনের বেতন, তাকে বিরত রাখলেন সরকারী কাজকর্ম থেকে, কিন্তু তাকে আদেশ দিলেন নিয়মিত তার যন্ত্র নিয়ে দরবারে প্রদর্শণী করার জন্য। ইউরোপের অন্যান্য দেশ থেকে প্রতিনিধিরা একের পর এক আমন্ত্রিত হতে থাকলেন মারিয়া টেরেসার সভায় আর প্রতিবারই ডাক পড়ল ফন কেমপেলেন আর তার মেকানিকাল টার্কের। প্রতিবারই অতিথিরা বিস্ময় আর হতাশা নিয়ে ফিরে গেলেন, কারণ প্রতিবারেই অনায়াসে জয় হল মেকানিকাল টার্কের।

মানুষের মনে জাগল নানান প্রশ্ন। তাহলে কি ক্যাবিনেটের ভিতরে বসে কোন ছোট ছেলে চুম্বকের সাহায্যে দাবার দানগুলো খেলছে; কুসঙ্কারচ্ছন্ন বা ধর্মভীরু মানুষ ভাবল হয়তো কোন অশরীরী আত্মা যন্ত্রের উপর ভর করেছে। কিন্তু প্রমাণ হল না কিছুই, দিনের পর দিন বিস্ময় আর প্রশ্ন নিয়েই ফিরে যেতে থাকল মানুষ। এক সময় মেকানিকাল টার্ক নিয়ে মানুষের উৎসাহেও ভাঁটা পড়ল। দশ বছর ধরে ঘরেই বসে থাকল মেকানিকাল টার্ক আর একটু হাঁফ ছেড়ে ফুরসত পেলেন ফন কেমপেলেন।

এরপর যখন মারিয়া টেরেসার ছেলে দ্বিতীয় জোসেফ সিংহাসনে বসলেন, তখন আবার ডাক পড়ল ফন কেমপেলেনের - তার সভায় রাশিয়ার জার আর তার স্ত্রীর সামনে প্রদর্শনীর জন্য। এবারেও এত অভিভূত হলেন নতুন সম্রাট, তিনি আদেশ দিলেন ফন কেমপেলেনকে - তার মেকানিকাল টার্ককে সাথে নিয়ে ইউরোপ সফর করার। ১৭৮৩ সালে শুরু হল সেই সফর - প্রথমেই প্যারিস।

প্যারিস সেই সময় দাবা খেলার চারণক্ষেত্র। বিশেষ করে কাফে দ্য লা রেজেন্সে তখন ভোলতেয়ার, রুসো, এবং এক জনৈক তরুণ নেপোলিয়নের মত তারকাদের ভীড়। মেকানিকাল টার্ক খুব অল্প সময়েই বিখ্যাত হয়ে গেল। মার্কিন দেশ থেকে খোদ বেঞ্জামিন ফ্রাঙ্কলিন এলেন খেলতে। তার তখন শুধু আবিষ্কারক নয়, দাবাড়ু হিসেবেও যথেষ্ট নামডাক ছিল। ফন কেমপেলেনের ইচ্ছে ছিল খেলার পর নিজের অন্যান্য কাজ আর আবিষ্কার নিয়ে বেঞ্জামিন ফ্রাঙ্কলিনের সাথে আলোচনা করার। কিন্তু মেকানিকাল টার্কের কাছে ধরাশায়ী ভাবে হেরে এত রাগে বেঞ্জামিন ফ্রাঙ্কলিন বেরিয়ে গেলেন যে সেই আলোচনার ইচ্ছে অধরাই রয়ে গেল। পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ দাবাড়ু ফ্রাশোয়াঁ আন্দ্রে ফিলিদর (François-André Philidor) শেষপর্যন্ত হারালেন মেকানিকাল টার্ককে, কিন্তু স্বীকার করলেন যে এত কঠিন প্রতিপক্ষের সাথে খেলতে তিনি সচরাচর অভ্যস্ত না।

প্যারিস ঘুরে মেকানিকাল টার্ক সফর করল ইংল্যান্ড, জার্মানীসহ ইউরোপের আরও অনেক দেশে। লম্বা দুবছর সফর করে যখন ভিয়েনাতে ফিরে এলেন, তখন ভন কেমপেলেন তাঁর কাঠের দাবাড়ুকে বিরতি দিলেন। তিনি নিজে অবসর নিলেন তাঁর ভিয়েনার বাড়িতেই। এরমধ্যে অবশ্য তার অন্যতম প্রিয় আবিষ্কার ‘কথাবলা মেশিন’ এর কাজ শেষ করেছেন। উলফগ্যাং ফন কেমপেলেন মারা যান ১৮০৪ সালে।

ফন কেমপেলেনের মৃত্যুর কিছু পরেই তার ছেলে মেকানিকাল টার্ককে বিক্রি করে দিলেন বাভারিয়ান আবিষ্কারক যোহান মায়েলজেলের (Johann Nepomuk Mälzel) কাছে। ১৮০৯ সালে হাবসবুর্গদের পরাস্ত করে ভিয়েনাতে তখন নেপোলিয়নের জয়জয়কার। তাকে মুগ্ধ করার জন্য সভায় নানা লোকের নানা প্রচেষ্টা। মায়েলজেল নিয়ে এলেন তার মেকানিকাল টার্ককে - আমন্ত্রণ করলেন নেপোলিয়নকে খেলার জন্য। প্যারিসের কাফে দ্য লা রেজেন্সের সময় থেকেই নেপোলিয়ন শুনে এসেছেন এই কাঠের দাবাড়ুর কথা। বিনা বাক্যব্যয়ে তিনি এই সুযোগ লুফে নিলেন। প্রথমবার ইচ্ছে করে একটা ভুল চাল দিলেন। মাথা নেড়ে ঠিক করে দিল মেকানিকাল টার্ক। এরকমভাবে তিন বার করার পর দাবার গুটি উল্টে খেলা ভণ্ডুল করে দিল মেকানিকাল টার্ক। মানুষের এই স্বাভাবিক প্রতিক্রিয়া মেকানিকাল টার্কের মধ্যে দেখে না রেগে বরং অভিভূত হলেন নেপোলিয়ন। আবার খেললেন তিনি, এবারে ঠিকভাবে এবং বেমালুম হেরে গেলেন।

এর কিছুদিন পর আবার হাতবদল হল মেকানিকাল টার্কের। নেপোলিয়নের পোষ্যপুত্র ইউজিন (Eugene de Beuharnais) মায়েলজেলের কাছ থেকে কিনে নিলেন তিনগুণ দামে। বাভারিয়ার মিউনিখে যখন ইউজিনের সাথে আবার দেখা হল মায়েলজেলের, তখন তিনি ফিরিয়ে মেকানিকাল টার্ককে - অবশ্য কিনেছিলেন না ধার নিয়েছিলেন তা নিয়ে মতভেদ আছে। লন্ডনসহ ইংল্যান্ডের অনেক জায়গায় মেকানিকাল টার্ক ভ্রমণ করল মায়েলজেলের সাথে। সব জায়গাতেই একদিকে উৎসাহ, বিস্ময় আর অন্যদিকে সন্দেহ প্রদর্শনীগুলোকে জনপ্রিয় করে তুলল। নতুনত্ব আর উৎসাহ বাড়াতে মায়েলজেল সাহায্য নিলেন এক নতুন কৌশলের। খেলার শুরুতেই তিনি মেকানিকাল টার্কের একটি বোড়েকে সরিয়ে নিলেন। তবুও অনায়াসেই জিততে থাকল মেকানিকাল টার্ক।

এরপর ১৮২৫ সালে মায়েলজেল সাগরপারী দিলেন - গন্তব্য বোস্টন, নিউ ইয়র্কসহ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের অন্যান্য শহর। আটলান্টিকের সেই পাড়েও রাতারাতি জনতার উৎসাহ, আগ্রহের কেন্দ্র হয়ে উঠল মেকানিকাল টার্ক। এর কিছু বছর পর মায়েলজেল ভাবলেন দক্ষিণ আমেরিকা সফরের কথা, যাত্রা শুরু করলেন ১৮৩৭ সালে। প্রথম থামলেন কিউবার হাভানাতে। সেখানে তেমন জনপ্রিয় হল না তার এই প্রদর্শনী। ৬৫ বছর বয়সে নতুন করে অনুপ্রেরণা পেলেননা মায়েলজেলও - তাঁর শরীরেরও অবনতি ঘটল। ঠিক করলেন আবার ফিরে যাবেন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে। পৌঁছনোর আগেই জাহাজেই মৃত্যু হয় তার। কিছু দিন পর এক নিলামে তোলা হল মেকানিকাল টার্ককে। বালটিমোরের এক ডাক্তার কিয়ারসলি মিচেল (John Kearsley Mitchell) কিনে নিলেন, উৎসাহী লোকেদের নিয়ে একটি ক্লাব তৈরি করলেন। সেই ক্লাব নিজেদের ঘনিষ্ঠমহলে প্রদর্শনী করতে থাকল এবং শোনা যায় খেলার পর মিচেল দর্শকদের কাছে কিছু গোপন রহস্যও প্রকাশ করতে থাকলেন। হয়তো সেই কারণেই মেকানিকাল টার্ককে নিয়ে উৎসাহ কমতে থাকল, শেষপর্যন্ত তার স্থান হল এক মিউজিয়ামে। ১৮৫৪ সালে সেখানেই এক অগ্নিকান্ডে ধ্বংস হয়ে সমাপ্ত হল মেকানিকাল টার্কের গল্প।

প্রায় ৭০ বছরেরও বেশি সময় ধরে মেকানিকাল টার্ক মানুষকে হতবাক করে এসেছে। অনেকেই অনেক রকম থিওরি বের করেছেন, কিন্তু সেই সময় কোনটাই বেশিদূর এগোয়নি। মিউজিয়ামের অগ্নিকান্ডের তিন বছর পর কিয়ারসলি মিচেলের ছেলে সাইলাস মিচেল (Silas Mitchell) একটি বই লিখলেন মেকানিকাল টার্কের যন্ত্রকৌশল আর গোপন রহস্য নিয়ে।

অনেকের সন্দেহই সত্য প্রমাণিত হল। কাঠের ক্যাবিনেটের ভিতর সব সময়েই লুকিয়ে থাকতেন একজন মানুষ এবং ভিতর থেকে কলকব্জার সাহায্যে প্রতিটি চাল নিয়ন্ত্রণ করতেন। ফন কেমপেলেন ছিলেন নকশা আর হাতসাফাই এর কাজেও তুখোড়। তিনি ক্যাবিনেটের ভিতরটা এমনভাবে তৈরি করেছিলেন যে সামনের দরজা খুলে দিলেও ভিতরে এদিক থেকে ওদিকে সরে গিয়ে লুকিয়ে থাকার জায়গা থাকবে আসল মানুষ দাবাড়ুর। ফন কেমপেলেন, মায়েলজেল - সহ সকলেই যেখানেই খেলা দেখিয়েছেন, প্রতি জায়গায় জোগাড় করে ফেলেছেন পরদার আড়ালে রাখার জন্য স্থানীয় কোন পারদর্শী দাবাড়ুকে। যথেষ্ট উপরি পারিশ্রমিক দিয়ে তাদের মুখও বন্ধ রাখা হয়েছে। এইভাবে বহু বছর যাকে ভাবা হয়েছিল বিজ্ঞান আর প্রযুক্তির এক অভাবনীয় আবিষ্কার - তা আসলে এক নিপুণ প্রতারণা আর বুজরুকি ছাড়া কিছুই ছিল না। হয়ত যারা দর্শক - তাদেরও অনেকটা দায় এর জন্য - হয়তো অনেক ক্ষেত্রেই অভিভূত বা মুগ্ধ হওয়ার অনুভূতিগুলো ছাপিয়ে গেছে তাদের বাস্তববুদ্ধি আর প্রশ্ন করার সদিচ্ছাকে। তার সাথে যুক্ত হয়েছে আরেক শ্রেণির মানুষের এই প্রতারণা থেকে অর্থলাভ আর প্রভাববিস্তার করার সুযোগ।

আজ এখানেই রাখি। আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স নিয়ে কথা বলতে শুরু করে হঠাৎ করে ২০০-২৫০ বছরের আগের একটা গল্প কেন বললাম বলতো? ভাবতে থাক। পরের সংখ্যায় আবার কথা হবে আর দেখবে এই ভাবা আর ভাবনাচিন্তা করার ইচ্ছেগুলোই তোমাদের পৃথিবীটা বোঝার জন্য কতটা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।

পাভেল ঘোষ পোর্টল্যান্ড, ওরেগন এর বাসিন্দা। কম্পিউটার এর খুঁটিনাটি নিয়ে পড়াশোনা ও কাজকর্ম করার ফাঁকে ফাঁকে দেশে বিদেশে ঘুরে বেড়াতে পছন্দ করেন; আর্সেনাল ক্লাব-এর একনিষ্ঠ ভক্ত।

আমরা, ভারতের জনগণ, ভারতকে একটি সার্বভৌম, সমাজতান্ত্রিক, ধর্মনিরপেক্ষ, গণতান্ত্রিক, সাধারণতন্ত্র রূপে গড়ে তুলতে সত্যনিষ্ঠার সঙ্গে শপথগ্রহণ করছি এবং তার সকল নাগরিক যাতে : সামাজিক, অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক ন্যায়বিচার; চিন্তা,মতপ্রকাশ, বিশ্বাস, ধর্ম এবং উপাসনার স্বাধীনতা; সামাজিক প্রতিষ্ঠা অর্জন ও সুযোগের সমতা প্রতিষ্ঠা করতে পারে এবং তাদের সকলের মধ্যে ব্যক্তি-সম্ভ্রম ও জাতীয় ঐক্য এবং সংহতি সুনিশ্চিত করে সৌভ্রাতৃত্ব গড়ে তুলতে; আমাদের গণপরিষদে, আজ,১৯৪৯ সালের ২৬ নভেম্বর, এতদ্দ্বারা এই সংবিধান গ্রহণ করছি, বিধিবদ্ধ করছি এবং নিজেদের অর্পণ করছি।

ফেসবুকে ইচ্ছামতীর বন্ধুরা