
আমার ঘরের জানলাটা খোলা ছিল, স্কুল থেকে ফিরে দেখছি বৃষ্টিতে খাটের একটা দিক ভিজে গেছে।
আগের বছর পর্যন্ত এসব নিয়ে আমায় ভাবতে হতো না। মা সব কাজ করে দিতো। ঘুম ভাঙার কাজটাও নিজে পেরে উঠতাম না, মায়ের জোরাজুরিতে চোখ খুলতে হতো। তারপর দৌড়োদৌড়ি করে চান ব্রেকফাস্ট সেরে মায়ের গুছিয়ে রাখা স্কুলব্যাগ নিয়ে বাসের জন্য দৌড়, এই ছিল রোজ সকালের রুটিন। খাটের কোণে ফেলে রাখা ভিজে গামছা, বাথরুমের রডে ঝুলতে থাকা বাসি জামা, এসবের গতি করার কথা মনেই থাকত না তাড়াহুড়োয়। স্কুল থেকে ফিরে ওগুলো চোখে পড়ত না বলে আর মনেও পড়ত না যে সকালে সরিয়ে রেখে যাইনি। রাতে খাওয়ার পর টিভি দেখা আমার খুব ছোটবেলার অভ্যেস। খেয়ে উঠে হাত ধুয়েই টিভির রিমোট নিয়ে বসে পড়ি বরাবর, থালা তোলা, টেবিল মোছা এসব করা উচিত বলে কোনওদিন মনেও হয়নি। মা করছে কি না সেসবও খেয়াল করে দেখিনি কখনও। বড়ই মসৃণ ছিল আমার চোদ্দ বছরের জীবনযাত্রা। ছিল, গত বছর পুজো পর্যন্ত।
পুজোর পর বাড়িতে একটা জমায়েত ছিল। মামারা, পিসিরা, আমার বন্ধু চিরশ্রী আর ওর বাবা মা, এই ক’জন এসেছিল। ওই বিজয়া সম্মিলনী টাইপের একটা ব্যাপার, বিকেলবেলায় সবাই এসে গল্পটল্প করে ডিনার সেরে বাড়ি যাওয়া।
বিজয়ার মেনু, বাঙালিয়ানায় ভরপুর নাকি হতেই হবে! তাই মা আগেরদিন থেকে ভয়ানক ব্যস্ত হয়ে কুচো নিমকি আর চন্দ্রপুলি করে রেখেছিল, একটু অন্যমনস্কও লাগছিল মাকে, নিমকির ময়দা মাখার সময় যেন কেমন নিজের মধ্যে ঢুকে ছিল, তিনবার ডাকলে একবার সাড়া দিচ্ছিল।
সেদিন সকাল থেকেই রান্নাঘরে, নারকেলকুচি দেওয়া ছোলার ডাল, পোলাও, মাংস, এই ছিল রাতের মেনু, আর স্ন্যাক্সে নিমকির সঙ্গে মাছের চপ। আমি আগেরদিন বলার চেষ্টা করেছিলাম, সবই কেন বাঙালি হবে, একটা ছোট পিৎজা বা বার্গার আনালে কী অসুবিধা হয়! মা ব্যস্ততার মধ্যেই অল্প করে শোনাচ্ছিল নিমকি নাড়ু এসবের মাহাত্ম্য, মা বাবা দুজনকেই খুব ইমোশনাল লাগছিল এসব গল্প করার সময়। আমি কিন্তু আলাদা করে কিছু বুঝতে পারছিলাম না। দুজনেই সারা বছর খুব নিয়ম মেনে খাওয়াদাওয়া করে, জাঙ্ক ফুড নয়, অতিরিক্ত তেলমশলা নয়, আমায় এসব জ্ঞান দিতে থাকে সারাক্ষণ, আজ হঠাৎ তেলে ভাজা নিমকি আর গুড়ে ভরা নাড়ুর জয়গান করছে কেন দুজনেই?
বিকেলে দেখলাম আমি আর চিরশ্রী কিছুটা অড ওয়ান আউট হয়ে আছি। চায়ের সঙ্গে নিমকি আর মাছের চপে সবাই আপ্লুত, মাঝে আমরা ছোটরা দুটো নিমকি আর একটা চপ হাতে নিয়ে বসে বসে এদের স্মৃতি রোমন্থন শুনছি। মায়ের দিদা নাকি দুর্দান্ত কুচো নিমকি বানাতেন, ওই নিমকি খাওয়ার পর আর কেউ কোনওদিন দোকান থেকে নিমকি কেনেনি। কে জানে নিমকি কী এমন আহামরি জিনিস, না কিনলে ক্ষতি কী হয়?
আমাদের মুখ দেখে বোধহয় পিসির একবার মায়া হল। মাকে নিচু স্বরে কিছু বলল। ঠোঁট নড়া দেখে বোঝার চেষ্টা করলাম, ইদানিং লিপরিডিং প্র্যাক্টিস করছি, সুবিধা আছে অনেক, কিন্তু "আনাবি কি?” ছাড়া আর কোনও কথা বুঝতে পারলাম না। কান খাড়া করলাম, কিন্তু মায়ের মাথা নাড়া আর "না না, বাড়িতে এতকিছু আছে, আর কী হবে?” শুনে বুঝলাম আশা নেই। চিরশ্রীকে নিয়ে উঠে গেলাম আমার ঘরে। ডিনারের আগে অব্দি বেরোইনি, দুজনে মেতে ছিলাম মায়েদের ছড়ি ঘোরানো নিয়ে নানান সমালোচনায়। সত্যিই আর পারা যায় না মাঝেমাঝে। সারাক্ষণ শুধু নিজেদের মতামত আমাদের ওপর চাপিয়ে দেবে, আমাদের না আছে নিজেদের ইচ্ছে, না আছে নিজেদের কথার জোর। কবে যে এদের হাত থেকে বেরোতে পারব জানি না।
ডিনারে সেই এক পোলাও আর একইরকম মাংস দেখেই মাথা গরম হয়ে গেল। জানতাম এটাই মেনু, তাও মেজাজ হারিয়ে ফেললাম। একটু ফ্রায়েড রাইস আর চিকেনের অন্য কোনও ডিশ করা যেত না?
"মা, সব অকেশনেই তোমার এই এক রান্না কবে চেঞ্জ হবে? কিছু তো অন্যরকম করতে পারো? না, সেই একই কাজু কিসমিস গিজগিজ করা মিষ্টি পোলাও আর গরম মশলার গন্ধওয়ালা মাংস। অসহ্য লাগছে আমার। আমার একটা কোনও কথা রাখা হয় না, আমার কোনও গুরুত্ব নেই এই বাড়িতে, জাস্ট পড়ে আছি, সব হচ্ছে তোমার ইচ্ছে মতো। সামান্যতম স্বাধীনতাটুকুও আমার নেই।"
কেউ বোধহয় পাশ থেকে হাত ধরে চুপ করানোর চেষ্টা করছিল, আমি হাত ছাড়িয়ে নিয়ে কথা চালিয়ে গেলাম। ভেতর থেকে সব লাভা গলগল করে বেরিয়ে যাওয়ার পর আগ্নেয়গিরি ঠাণ্ডা হল। চিকেনের জাস্ট দুটো পিস তুলে মুখে দিয়ে ঘরে চলে গেলাম। থাকুক ওরা ওদের নস্টালজিয়া আর বাঙালিয়ানা নিয়ে, আমি পারলাম না।
পরেরদিন সকালে ঘুম ভাঙল অনেক দেরিতে, চোখে রোদ্দুর পড়ছিল বলে বুঝলাম দেরি হয়ে গেছে।
"মা ডাকোনি কেন? স্কুল যাব কখন?”
"যাবি না আজ। স্কুল শুরু হয়ে গেছে।"
ঘড়ির দিকে তাকিয়ে দেখি সত্যিই তো! এতক্ষণ ঘুমিয়েছি বুঝতেই পারিনি। কাল একটা বিচ্ছিরি এক্সকিউজ দিতে হবে আজ না যাওয়ার জন্য, কোনও মানে হয়!
"ডাকোনি কেন?”
"অ্যালার্ম দেওয়া ছিল। শুনতে পাসনি হয়তো। খেয়ে পড়তে বসবি তো বোস।"
অ্যালার্ম শুনতে পাইনি সত্যিই। আর কথা না বাড়িয়ে মুখ ধুয়ে এসে বসে পড়লাম। যাক তাও ভাল কাল রাতের পোলাও নেই ব্রেকফাস্টে। রাতে খাওয়াদাওয়া থাকলে পরেরদিন ব্রেকফাস্ট অব্দি সেটাই চলে দেখি, কালকের চেঁচামেচিতে এটা অন্তত লাভ হয়েছে।
সেদিন সারাদিন আর সেরকম কোনও অশান্তি হল না, অন্যান্য দিন বাড়িতে থাকলেই যেমন হয়।
সেদিন কেন, তারপর থেকে কোনওদিনই আর সেভাবে অশান্তি হয়নি গত এক বছরে। চেঁচামেচি যে একেবারেই হয়নি তা নয়, পছন্দের খাবার না পেয়ে আমিই চিৎকার করেছি একেকদিন, থালা সরিয়ে উঠেও গিয়েছি, মা বাবা কেউই ডেকে আনেনি আমায়, আগে যেমন করত। পরে একসময় আমিই ক্ষিধে সহ্য করতে না পেরে এসে খাবার খুঁজেছি, কিন্তু অবাক হয়ে দেখেছি ফ্রিজে আমার জন্য কিছুই রাখা নেই। শেষে একমুঠো মুড়ি খেয়ে রাত কেটেছে। অ্যাণ্ড আই হেট মুড়ি। তাই না খেয়ে রাগ দেখানোর অভ্যেসটা আস্তে আস্তে আমায় ছাড়তে হয়েছে। মা যা রান্না করছে তা-ই কোনওরকমে গিলে নিই। রান্নাঘরে রোজকার মেনুর একটা লিস্ট টাঙানো থাকছে আজকাল, তাতে তবু দেখতে পাই কবে আমার পছন্দের কিছু আছে, সেইদিনগুলোর দিকে তাকিয়ে দিন কাটে।
স্কুল, পড়াশোনার ব্যাপারেও চেঁচামেচি করা মা একেবারেই বন্ধ করে দিয়েছে। এই একবছরের প্রথমদিকে আমার মাঝেমধ্যেই স্কুল কামাই হতো। অ্যালার্ম শুনতে পেতাম না, রোদ্দুরও ঢুকত স্কুল শুরু হয়ে যাওয়ার পর। ধীরে ধীরে অ্যালার্ম শোনার জন্য কান তৈরি হয়েছে, ঘুম তৈরি হয়েছে। এখন আর দেরি হয় না। রোজ সন্ধেবেলার পড়তে বসাটা এখনও মায়ের কাছেই হয়, কিন্তু মা অদ্ভুত নিস্পৃহভাবে আমায় পড়ায়। খুব যে খারাপ লাগে তা নয়, আগে যেন বড্ড বেশি কথা বলত। তবে খুব যে আরাম পাই তা-ও নয়। চিৎকারগুলো মিস করি কি? তা-ই বা কী করে হবে? সারাক্ষণ সবকিছু নিয়েই চাপানউতোর লেগে থাকত, এখন সেটা হয় না, ভালোই তো। মা সম্ভবত আমায় স্বাধীনভাবে বাঁচার জন্য জায়গা দিচ্ছে।
স্বাধীনতা এলে তার হাত ধরে দায়িত্বও আসে, সেটা এই একবছরে শিখছি। আমার একটা খুব সুন্দর সাদা ওয়ান পিস ড্রেস ছিল। শিবালিকের জন্মদিনে পরে গিয়েছিলাম। এসে খাটে খুলে রেখেছি মনে নেই। পরেরদিন চান করে খেয়ে স্কুলে চলে গিয়েছিলাম, বাড়ি এসে দেখছি ড্রেসটার ওপর আমার ভিজে গামছাটা রাখা আছে। আমারই ভুল। হায় হায় করে গামছা সরিয়ে দেখি যা হওয়ার হয়ে গেছে, সাদা ড্রেসের এখানে ওখানে গামছার লালচে কষের ছোপ। সেদিনই আরও বেশি করে বুঝলাম স্বাধীনভাবে নিজের দায়িত্ব নিতে গেলেও তৈরি হতে হয়। আমি কি পারছি নিজে তৈরি হতে? যার অষ্টপ্রহর ছড়ি ঘোরানোয় অতিষ্ঠ হয়ে উঠেছিলাম, সে-ই কি তার আপাত উদাসীনতার মোড়কে আমায় তৈরি করে নিচ্ছে না?
আজ দুপুর থেকেই বড্ড এলোমেলো হাওয়া বইছে। মেঘ ঘনিয়েছিল সকাল থেকেই, স্কুল থেকে ফেরার পথে বৃষ্টি নামল। আজকাল টেবিলে খাবার ঢাকা দেওয়া থাকে, আমি ফেরার সময়টা মায়ের বিশ্রামের সময়। আমিও ডাকি না, খেয়ে থালা তুলে সব পরিষ্কার করে ঘরে চলে যাই। আজ ঘরে যেতে ইচ্ছে করল না, মায়ের ঘরের লাগোয়া ব্যালকনিতে কয়েকটা গাছ আছে, ওগুলোকে ছুঁতে ইচ্ছে করছিল। ওগুলোকেই, নাকি অন্য কাউকে, যার কাছে পৌঁছোতে চেয়েও পৌঁছোতে পারছি না, দূরত্ব বেড়েই চলেছে, তারই আঙুল ছুঁতে চাইছি কি?
"মা, বৃষ্টি পড়ছে।"
"জানি। বোস।"
"জানলা বন্ধ করবে না? ভিজে যাচ্ছে সব।"
"ভিজছে না, ধুয়ে যাচ্ছে। ধুয়ে যেতে দে।"
কিছুটা বুঝলাম, অনেকটাই বুঝলাম না। বসলাম মায়ের পাশে। মা ছবি আঁকছিল ছোট্ট একটা খাতায়। বৃষ্টির ছবি, গুঁড়ো গুঁড়ো বৃষ্টি। এই বৃষ্টিটার নাম জানি আমি, ইলশেগুঁড়ি। মা-ই শিখিয়েছিল , এমন বৃষ্টি হাত বাড়িয়ে ধরতে হয়, গায়ে মেখে নিতে হয়।
"খিচুড়ি করব আজ রাতে।"
"জানি, রান্নাঘরের লিস্টে নেই, তাও।"
একটু থেমে যোগ করি,
"কাল একটা এক্সপেরিমেণ্ট করবে?”
"কী?”
"খিচুড়ি ফ্লেভার্ড কুকিজ।"
মা চশমার ফাঁক দিকে তাকিয়ে রইল কিছুক্ষণ।
"লিস্ট কর কী কী লাগবে। তোর ব্যাঙ্ক থেকে টাকা বের কর, জিনিস এনে রাখ। আমি বা তোর বাবা কিছু আনতে পারব না। কাল সকালের আগে জিনিসপত্র সব যেন জোগাড় থাকে।"
একবছরে প্রথমবার। ধুয়ে যাচ্ছে সত্যিই। মা ঠিকই বলছিল একটু আগে। জানলা খুলে রাখতে হয়।
হাতের ছবিটা নামিয়ে রেখে মা উঠল। মায়ের আঁচলে একবার হাতটা মুছে নিলাম। অকারণেই।
ছবি: গুগ্ল্ জেমিনাই

