
আমরা ছোটবেলায় একটা শব্দ শুনতাম কালাপানি,তোমরাও শুনেছ নিশ্চয়। না শুনলেও ইতিহাস বইয়ে আমাদের স্বাধীনতা সংগ্রামের কথা কিছুটা নিশ্চয় পড়েছ। দীর্ঘ দু’শো বছর ধরে ইংরেজরা আমাদের দেশটাকে দখল করে রেখেছিল।শাসনের সঙ্গে সঙ্গে শোষন ও নানা রকম অত্যাচারও চালাতো এ দেশের সাধারণ মানুষের ওপর। তাদের হাত থেকে ভারতবর্ষকে মুক্ত করেছিল যারা, স্বাধীনতা আন্দোলনের সেই বিপ্লবীদের মধ্যে যাদের খুব বিপজ্জনক মনে করতো ইংরেজ শাসক, তাদেরকে শাস্তি স্বরূপ কালাপানিতে নির্বাসনে পাঠাতো। যাতে মূল ভূখন্ডে ফিরে না আসতে পারে।এই কালাপানি আসলে প্রায় পাঁচশ বাহাত্তরটা ছোট ছোট দ্বীপ নিয়ে গঠিত আন্দামান দ্বীপপুঞ্জ। কালাপানি নামটা শুনলে ভয় করতো বটে তবে ভেতরে একটা টানও ছিল, জলবিভাজনে ভারতের মানচিত্র থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে বঙ্গোপসাগরের বুকে ভেসে থাকা এই ভূখণ্ডটির প্রতি। কল্পনা করতাম কালোজলে ঘেরা শ্বাপদসঙ্কুল এক জঙ্গল ঘেরা দ্বীপ।
কিন্তু প্রথমবার আন্দামানে পা দিয়ে মুহূর্তে কল্পনার সেই ছবিটা মুছে গেল। প্রধান শহর পোর্টব্লেয়ার পৌঁছে মুগ্ধ হয়ে গেলাম। কোথায় কালাপানি ! এ তো যতদূর চোখ যায় শুধু নীল জল, মাঝে মাঝে অসংখ্য সবুজ দ্বীপ। বলা হয় তার মধ্যে মাত্র ত্রিশ বা একত্রিশটা দ্বীপে বসতি আছে। কিন্তু যারা আন্দামান বেড়াতে যায়,তাদের জন্যে রস, জলিবয়,নর্থ বে, হ্যাভলক, নীল, আর স্মিথ অ্যান্ড রস, মাত্র এই পাঁচ ছ’টি দ্বীপে যাওয়ার অনুমতি আছে। স্মিথ অ্যান্ড রসকে বলা হয় টুইন আইল্যান্ড। জোয়ারের সময় মিলেমিশে থাকলেও ভাঁটার সময় দুটো দ্বীপ আলাদা হয়ে যায়। এখানে ভ্রমণার্থীদের আনাগোনা কম বলে এখনও এর সৌন্দর্য অটুট।
জলিবয় আইল্যান্ডের হোয়াইট স্যান্ড বিচে ঘন নীল জলের নিচে দৃশ্যমান কোরাল রিফ ঘিরে বিচিত্র সব মাছের বিচরণ। সেটা এক অনন্য অভিজ্ঞতা। অপূর্ব এই দ্বীপটিতে শুধু পরিদর্শনের জন্যে যাওয়া যায়, তাও বছরের একটা নির্দিষ্ট সময়ে। কোরাল রিফটিকে দূষণের হাত থেকে বাঁচানোর জন্যে এই ব্যবস্থা।এমনিতে বিচ জুড়ে মৃত কোরালের ছড়াছড়ি। রাত্রিবাস করা যায় শুধু পোর্টব্লেয়ার,হ্যাভলক আর নীলদ্বীপে। সেখানে যাওয়ার জন্যে সরকারী এবং বিলাসবহুল বেসরকারী জলযান আছে।
পোর্টব্লেয়ার,ডিগলিপুর, হ্যাভলক, নীল। এই সব জায়গায় মূলত যারা থাকে তারা সকলেই সাতচল্লিশ সালে দেশভাগের পর পূর্বপাকিস্তান থেকে চলে আসা উদ্বাস্তু পারিবার। জাহাজ ভর্তি করে যাদের এককথায় নির্বাসনে পাঠিয়েছিল ভারত সরকার। তারা জঙ্গল কেটে আবাদ করেছিল। বাসযোগ্য বসত গড়ে নিয়েছিল এখানে। সেটা ছিল তাদের কঠিন জীবন সংগ্রাম।এখন ওটাই তাদের দেশ। আর বাকি দ্বীপ গুলোতে আদিবাসী জনজাতিদের বাস। যেমন জারোয়া (Jarawa), ওঙ্গে, শম্পেন,নিকোবরিস,সেন্টিনেল ইত্যাদি…। দক্ষিণ আন্দামান ও মিডল আন্দামানের পশ্চিম দিকের আভ্যন্তরীণ বনাঞ্চলে তাঁদের ঐতিহ্যগত বসতি। এরাই আন্দামান দ্বীপপুঞ্জের আদি অধিবাসী। এদের জীবনধারণ শিকার ও বনজ সামগ্রী নির্ভর । তাদের নিজস্ব ভাষা ও সংস্কৃতি রয়েছে। এদের সঙ্গে মূল ভূখণ্ডের বাসিন্দাদের মেলামেশা করার নিষেধাজ্ঞা আছে। মূলত তাঁদের সুরক্ষা এবং নিজস্ব জীবনধারা রক্ষার জন্য।এটা আন্দামান সম্পর্কে মোটামুটি একটা ধারণা দিলাম তোমাদের।
কিন্তু আজ আমি আন্দামান ভ্রমণের গল্প বলব না। আন্দামানের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য ছাপিয়ে যেটা আমাকে উদ্বেল করেছে তার কথাই বলবো তোমাদের।

সেলুলার জেল চত্বরের ভেতরে
আন্দামান যাওয়ার অন্যতম আকর্ষণ ছিল সেলুলার জেল। পোর্টব্লেয়ারে সমুদ্রের ধার ঘেঁষে এই বন্দীশালা।এক সময় বৃটিশরা তৈরি করেছিল। মনোমুগ্ধকর প্রাকৃতিক সৌন্দর্যর মাঝখানে পড়ে থাকা একটা স্থাপত্য, যেখানে ভারতের স্বাধীনতার আশি বছর পরেও ইতিহাসের একটা অধ্যায় কারারুদ্ধ হয়ে আছে। ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলনের এক যন্ত্রনাদায়ক অথচ গর্বের একটি অধ্যায়। যে কোনো ভারত বাসীর চোখে জল এনে দেওয়া এক কাহিনি। নির্বাসনের কাহিনী। হ্যাঁ নির্বাসিতই বলবো। সেলুলার জেলের ইতিহাস শুধু ইট-পাথরের ইতিহাস নয়, এটি মানুষের অদম্য মানসিক শক্তির ইতিহাস।বৃটিশ শাসকের দেওয়া একাকী বন্দিত্ব, শিকল, চাবুকের আঘাত, আর অমানুষিক পরিশ্রমের মধ্যেও যাঁদের সবচেয়ে বড় প্রতিজ্ঞা ছিল দেশকে স্বাধীন করা, তাদের কাহিনী। বিশেষভাবে উল্লেখ করতেই হয় তাদের মধ্যে অধিকাংশ বাঙালি। যারা নিজেদের উৎসর্গ করেছিল বিদেশী শাসকের হাত থেকে নিজের মাতৃভূমিকে মুক্ত করার প্রতিজ্ঞা নিয়ে।

জেলের করিডোর এবং বন্দি কুঠুরি
চারদিকে উঁচু পাঁচিল ঘেরা এই বন্দীশালাটি একটি বৃত্তাকার ঘরকে কেন্দ্র করে সাত দিকে প্রসারিত সাতটি বাহু। যেন জ্বলন্ত সূর্যের সাতটি রশ্মি। তাতে প্রায় সাতশ’টি অন্ধকার কুঠুরি। যার এক কোনে একটি ছোটো চৌকোণা গর্ত,যেটা টয়লেট হিসেবে ব্যবহার করতে হতো বন্দীদের। কুঠুরিগুলো এমন, যেন আকাশ তো দূরে থাক কেউ কারো মুখ দেখতে না পায়,কথা বলা তো দূরের কথা।এতটাই বিচ্ছিন্ন করে রাখা হতো তাদের।সঙ্গে চলতো কঠিন পরিশ্রম আর অত্যাচার। প্রথম বার ওই কুঠুরির সামনে টানা করিডোরে গিয়ে দাঁড়াতেই আপনা আপনি যেন কানে বেজে উঠলো – ‘মুক্তির মন্দির সোপান তলে যত প্রাণ হলো বলিদান, লেখা আছে অশ্রুজলে…’।
সেই অশ্রুজলের কথা ইতিহাসে লেখা থাকে না।ওখানে পা রাখলে সেটা অনুভব করা যায়। সেলুলার জেলে বন্দীজীবন কাটানো দু’একজন বিপ্লবীর স্মৃতি কথা থেকে সব জানা যায়। বিপ্লবী বারীন্দ্রকুমার ঘোষ তাঁর স্মৃতিকথায় লিখেছিলেন যে, সেলুলার জেলে মানুষের দেহকে বন্দী করা গেলেও মনকে বন্দী করা যায়নি। বন্দীরা সুযোগ পেলেই চিৎকার করে একে অপরকে গান শোনাতেন, কবিতা আবৃত্তি করতেন, কিংবা দেয়ালে টোকা দিয়ে সংকেতের মাধ্যমে কথা বলতেন। স্বাধীনতার স্বপ্নই ছিল তাঁদের বেঁচে থাকার শক্তি।
বিস্ময় ও শ্রদ্ধায় চোখে জল এলো, যখন দেখলাম জেলের কেন্দ্রে থাকা ওই বৃত্তাকার ঘরটিতে শ্বেতপাথরের ফলকে যে বিপ্লবীদের নাম খোদাই করা আছে, তাঁদের মধ্যে চারভাগের তিনভাগই বাঙলার সন্তান। মনে হলো আমরা সেই গর্বিত বাঙালি, যাদের পূর্বসূরিরা ভারতবর্ষকে বিদেশী শাসকের হাত থেকে মুক্ত করার জন্যে নিজেদের জীবন উৎসর্গ করেছিল। বাংলা ছিল সশস্ত্র বিপ্লবী আন্দোলনের অন্যতম প্রধান কেন্দ্র। ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামে তাদের ভূমিকা ছিল উল্লেখযোগ্য। এদের মধ্যে সেলুলার জেলের এক বেদনাদায়ক নাম ইন্দুভূষণ রায়। মাত্র ঊনিশ বছর বয়সে ইংরেজ শাসকের অমানবিক অত্যাচার ও অসহনীয় মানসিক যন্ত্রণা সহ্য করতে না পেরে ওই সেলুলার জেলেই তাঁর মৃত্যু হয়।ওঁর একটা পাথরের মূর্তি রাখা আছে জেলের বাইরে একটা চত্বরে। উল্লাসকর দত্তের ওপরও এতটাই নির্যাতন করা হয়েছিল যে তাঁর স্বাস্থ্যের মারাত্মক ক্ষতি তো হয়েই ছিল,এমন কি মানসিক বিকৃতি ঘটেছিল। তবু তিনি স্বাধীনতার আদর্শ থেকে সরে আসেননি।
পোর্টব্লেয়ারের সবচেয়ে নিকটতম দ্বীপ হলো রস আইল্যান্ড। সেখানে ছিল বৃটিশ সরকা্রের প্রশাসনিক দপ্তর । তোমাদের মনে প্রশ্ন জাগতে পারে ওই নির্জন দ্বীপে হঠাৎ প্রশাসনিক দপ্তর কেন ?
আন্দামান দ্বীপপুঞ্জ তো বঙ্গোপসাগরের মাঝামাঝি, ভারতীয় উপকূল ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার সমুদ্রপথের কাছে। তাই সমুদ্রপথ নিয়ন্ত্রণ ও নজরদারির জন্য জায়গাটি বেছে নিয়েছিল ইংরেজ সরকার। ওরা চাইত বঙ্গোপসাগরে তাদের নৌ-প্রাধান্য বজায় রাখতে। প্রাকৃতিক বন্দর ও সমুদ্রপথের কারণে পোর্টব্লেয়ার এই উদ্দেশ্যে উপযোগী ছিল। এছাড়াও রাজনৈতিক বন্দিদের নির্বাসন ও কঠোর শাস্তির জায়গা হিসেবে ওদের কাছে এটাকে উপযুক্ত মনে হয়েছিল। সেজন্যেই পরে পোর্টব্লেয়ারে সেলুলার জেল বানিয়েছিল।
ব্রিটিশদের বাসস্থান ছিল যে শহর, আজ সেখানে ধ্বংসস্তূপরস আইল্যান্ডে শুধু যে প্রশাসনিক দপ্তর ছিল তা নয়, ব্রিটিশরা সেখানে ছোট্ট একটি ‘colonial township’ গড়ে তুলেছিল। চারপাশে সুন্দর বাগান, গাছপালা ও সমুদ্র—দূর থেকে দেখলে জায়গাটি ব্রিটিশ ভারতের কোনো অভিজাত ছোট শহর মনে হবে। কী না ছিল সেখানে- চার্চ,হাসপাতাল, বেকারি, সুইমিংপুল,ক্লাবহাউস ব্রিটিশ অফিসারদের আবাসন, সৈন্যদের ব্যারাক,নানারকম বিনোদন, বিদ্যুৎ সরবরাহের ব্যবস্থা- সবরকম প্রয়োজনীয় পরিষেবা। রস আইল্যান্ডকে একসময় ‘Paris of the East’ বলা হতো বলে প্রচলিত আছ। কারণ ব্রিটিশরা সেখানে সাজানো-গোছানো ইউরোপীয় ধাঁচের জীবন তৈরি করেছিল।
আর এর বিপরীতে ছিল ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামীদের জন্যে সেলুলার জেলের দুর্বিসহ বন্দিজীবন।এখানেই ইতিহাসের সবচেয়ে নিষ্ঠুর বৈপরীত্য।কিন্তু দেখ, কালের পরিহাসে বৃটিশদের সেই ঔদ্ধত্, বিলাসবহুল বসতি আজ ধ্বংসস্তুপ। সেটা এখন ভ্রমণার্থীদের জন্যে বিশেষ দর্শণীয় স্থান।
এবার ইতিহাসের আর একটা পাতা উলটে দেখি ।
১৯৪২ এ দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় জাপানের সেনাবাহিনী আন্দামান দখল করলে বৃটিশরা আন্দামান দ্বীপ ছেড়ে চলে যায়। ১৯৪৩ সালে নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসু, জাপান-সমর্থিত আজাদ হিন্দ সরকার-এর প্রধান হিসেবে আন্দামানে আসেন।
৩০ ডিসেম্বর আন্দামানের ইতিহাসের অত্যন্ত স্মরণীয় একটা দিন।কেন জানো ? ভারতের পূর্ণ স্বাধীনতা আসার আগেই পোর্টব্লেয়ারে নেতাজি সুভাষ চন্দ্র বসু ভারতের ত্রিবর্ণ পতাকা উত্তোলন করেন। এই ঘটনাকে ভারতীয় স্বাধীনতা সংগ্রামের প্রতীকী ইতিহাসে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়। অর্থাৎ একসময় যে দ্বীপপুঞ্জ ছিল ব্রিটিশদের দণ্ড-উপনিবেশ, সেখানেই এসে একজন বাঙালি স্বাধীনতা সংগ্রামী স্বাধীন ভারতের পতাকা তুললেন। দ্বীপগুলিকে তিনি স্বাধীন ভারতের সংগ্রামের সঙ্গে প্রতীকীভাবে যুক্ত করেছিলেন। শোনা যায় নেতাজি আন্দামান ও নিকোবর দ্বীপের নতুন নামকরণও করেছিলেন -স্বরাজ ও শহিদ দ্বীপ। পরবর্তীকালে নেতাজির সেই প্রস্তাবকে সম্মান জানিয়ে রস আইল্যান্ডের নাম সুভাষ চন্দ্র বসু দ্বীপ রাখা হয়। আর হ্যাভলক ও নীলদ্বীপের নাম হয় যথাক্রমে স্বরাজ দ্বীপ ও শহিদ দ্বীপ।
এবার তোমরাই বলো,আমরা তীর্থ বলি কাকে? যেখানে আপনিই মাথা নত হয়ে আসে শ্রদ্ধায় ভালোবাসায়, তাই তো? সেলুলার জেলকে আমার মনে হয়েছে তেমনি এক তীর্থ। ভারততীর্থ।
নিচে রইল জেলের কেন্দ্রে থাকা বৃত্তাকার ঘরে বিপ্লবীদের নাম লেখা শ্বেতপাথরের ফলকগুলির কিছু ছবি।
ছবি: লেখক

