
"শুনেছিস?"
"কী শুনব?"—দাদুর প্রশ্নের প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই উত্তরটা দিলাম।
দাদু মুখ থেকে পেপারটা নামিয়ে আমার দিকে তাকিয়ে বলল,"মাধ্যমিকের রেজাল্টের ডেট দিয়ে দিয়েছে তো।"
"কী বললে? কবে?"
আমার হাতের চায়ের কাপটা পড়তে গিয়েও পড়ল না। কাপটা নামিয়ে রেখে দাদুর হাত থেকে পেপারটা নিয়ে দেখলাম—আর মাত্র কুড়ি দিন পরেই রেজাল্ট।
সারারাত সিনেমা দেখে ভোররাতে ঘুমিয়েছিলাম। কিন্তু মায়ের চিৎকারে সকাল সকাল উঠে পড়তে হল। ঘুম থেকে ওঠার পর থেকেই একটা হালকা মাথাব্যথা লেগেই ছিল। ভাবলাম, চা খেলেই ঠিক হয়ে যাবে।
কিন্তু চায়ের সঙ্গে দাদু যে মচমচে খবরটা দিল, তাতে মাথাটা আবার দপ করে উঠল।
বিচ্ছিরিভাবে শুরু হল দিনটা।
বসন্ত চলে গেলেও দূরের গাছ থেকে কোকিলটা তখনও ডেকেই চলেছে—কী সমস্যা ওর, কে জানে!
আমাদের মাধ্যামিক শেষ হয়েছে তাও দুমাস হবে ।ম্যাথ, ফিজিক্স, কেমিস্ট্রি আগের মাস থেকেই পড়তে যাওয়া শুরু করেছি ।কিন্তু এই সিনেমা সিরিস দেখার নেশাটা কোনো রকমেই কাটাতে পারছিনা । আসলে আমারও দোষ না, পড়তে বসলেই মাথার মধ্যে হাজার চিন্তা কোথা থেকে যে চলে আসে ,কে জানে ।
" আদৌ আমি ক্লাস ইলেভেন এ সাইন্স পাবো তো?। ফুলিয়ায় ভালো টিচার নেই বলে তো ঘটা করে রানাঘাটে ভর্তি হলাম।সব কি বিফলে যাবে?" এইসব চিন্তা গুলো আজ আরও হিজহিজ করতে লাগল মাথার মধ্যে ।
সন্ধ্যেয় আবার অঙ্ক পড়তে যেতে হবে রানাঘাট ।
দুপুর হতেই মাথাব্যথাটা একেবারে মাত্রাছাড়া হয়ে গেল। কোনওরকমে দুপুরে খেয়ে ঘুমিয়ে পড়লাম।
মাকে বললাম,"পাঁচটায় ডেকে দিও তো ।"
দেড় ঘণ্টায় কম করে ত্রিশটা ছোট ছোট স্বপ্ন দেখলাম।
ঠাকুমা আমাকে ঝাঁকিয়ে তুলল।চোখ খুলে দেখি, পাঁচটা কুড়ি বেজে গেছে।
রাগের স্বরেই ঠাকুমাকে বললাম,"মা কোথায়? মাকে তো বললাম পাঁচটায় ডেকে দিতে!"
ঠাকুমা একটু মুখ বেঁকিয়ে বলল,"ওই কোন বাড়িতে ঝগড়া লেগেছে, সেখানে দেখতে গিয়েছে। ওর এসবের হুঁশ আছে নাকি?"
আমি আর কথা বাড়ালাম না। যত তাড়াতাড়ি সম্ভব, তার থেকেও তাড়াতাড়ি বেরিয়ে পড়লাম।
৫:৪৮-এর ট্রেন।
সাইকেল গ্যারেজে রেখে ছুটতে ছুটতে স্টেশনে ঢুকে দেখি, ইতিমধ্যেই বন্ধুরা পৌঁছে গেছে। আর ওদিকে ট্রেনও ঢুকে পড়েছে।
কোনওমতে ট্রেনে উঠে ওদের গালাগালি খাওয়া আর হাঁপানোর মধ্যেই মনে পড়ল—"ইশ! মানিব্যাগটাই তো আনা হয়নি! ধুর!"
আমি আর ওদের কিছু বললাম না। কারণ কোথাও সাধারণভাবে টাকা লাগার কথা না।
গালাগালি খাওয়ার হাত থেকে বাঁচার জন্য ওদের ফোকাসটা আমার থেকে অন্যদিকে শিফট করার চেষ্টা করলাম।
ঋতমের কানের কাছে মুখ নিয়ে বললাম"ওই, তোর পেছনে দেখ, ঋত্বিকা না?"
সুপ্রিয় টক করে একবার তাকিয়ে নিয়ে বলল "হ্যাঁ হ্যাঁ।"
এই বিকেলের দিকে ডাউন ট্রেনগুলো ফাঁকাই থাকে । ভিতরের দিকে বিক্ষিপ্ত ভাবে কয়েকটা সিট থাকলেও আমরা ৫ জন সারাক্ষণ এই গেটের মুখে দাঁড়িয়েই যাই।
ঋতম ঋত্বিকা প্রেমে পড়েছে নাকি ওর গালের ডিম্পলটার প্রেমে পড়েছে এই নিয়ে আলোচনা করতে করতে যে কখন হাবিবপুর আর কালিনারায়ণপুর জংশন ছেড়ে রানাঘাট এ পৌঁছে গেলাম খেয়ালই হয়নি।
"আজ স্যার ট্রিগনোমেট্রির যে ফরমূলাগুলো বোঝালো! কিছুই তো বুঝতে পারলাম না।" ব্যাচ থেকে বেরিয়ে সায়ন বলল।
আমিও সায় দিলাম,"ধুর! সকালে উঠে যদি রেজাল্টের ডেট জানা যায়, সেই দিনটা কেমন যাবে সেটা বোঝাই যাচ্ছে।"
সুপ্রিয় দুজনের মাঝখানে ঢুকে দুজনের কাঁধে হাত দিয়ে বলল,"আরে ভাই, দিন খারাপ গিয়েছে তো কী হয়েছে? রাতটাকে রঙিন করি চলো।"
"চল, চূর্ণীর ঘাটে গিয়ে বসি।"
একম ঘড়ি দেখে বলল,"৮:৩৫ বাজে। আমার তো একটু বাবার দোকানে যেতে হবে। তোরা চারজন ঘুরে আয়, আমি স্টেশনে চলে যাব। আর নইলে কল করে নিস।"
আমাদের চারজনের মধ্যে ফোন ছিল শুধু সুপ্রিয়র কাছে।
সুপ্রিয় ঘাড় নেড়ে বলল,"ঠিক আছে ভাই।"-- আমরা যথারীতি চূর্ণীর ঘাটে গিয়ে বসলাম।
সুপ্রিয় বলল,"দাঁড়া, তিনটে চা নিয়ে আসি।"
আমার মাথাধরা তখনও কমেনি।আমি বললাম,"আমার জন্য কিন্তু লিকার।"
আমি বলতেই সুপ্রিয় আর সায়ন হাসতে হাসতে বলল,"এখানে লিকার কোথায় পাবি?"
আমি বললাম,"দুধ চা থাকলে লিকার চা নিশ্চয়ই থাকবে।"
সুপ্রিয় মুখ চেপে হাসতে হাসতে বলল,"ও লিকার চা! দাঁড়া, বলে দিচ্ছি, দিয়ে যাবে। অর্ডার দিয়ে আসি । "
ও যেতেই সায়ন বলল,"আরে, লিকার মানে তুই জানিস না?"
আমি বললাম,"না।"
ও তাচ্ছিল্যের স্বরে বলল,"বাড়ি গিয়ে গুগল করে নিস।"
আমি আর ওর দিকে তাকালাম না।চূর্ণীর দিকে তাকালাম।চাঁদটা কেমন যেন মন খারাপ করে আকাশে ঝুলে আছে। নাকি আমার মন খারাপ বলেই ওকেও অমন লাগছে?বাতাসটাও কেমন একটা একটা করে আসছে, আর বলে দিয়ে যাচ্ছে—"৮ মে, তোর রেজাল্ট।"
দূরে একটা বাচ্চা কাঁদছে।আমারও কেন জানি মনে হল, আমিও যদি একটু কাঁদতে পারতাম!মনে হয় মনটা হালকা হত।আরও কত কী যে ভাবলাম, আমি নিজেও জানি না।ওরাও পাশে বসে কীসব নিয়ে গল্প করল, আমি তাও জানি না।
শুধু জানি—আমার ৮ মে রেজাল্ট , আমি যে সারা বছর কতটা ফাঁকি দিয়েছি, তার হিসেব।
হঠাৎ একটা কুকুরের চিৎকারে হুঁশ ফিরল।
"কী রে, কটা বাজে? ট্রেন ধরব তো! আর ভালো লাগছে না এখানে"—আমি নদীর দিক থেকে চোখ ফিরিয়ে বললাম ।
ওরা বলল, "এখনও দেরি আছে। সেই ৯:৩৫-এর ট্রেন ,এখন সবে ৯:১৫ বাজে।"
আমি জোর করলাম, "চল! ভালো লাগছে না একদম। স্টেশনের দিকে তো চল।"
আমরা হাঁটতে হাঁটতে স্টেশনের দিকে যাওয়ার সময় একমকে ওর বাবার দোকান থেকে নিয়ে গেলাম।
স্টেশনে পৌঁছে আবার সেই ঋত্বিকা।
সায়ন আর সুপ্রিয় ঋতমকে প্রায় টানতে টানতেই ওর পেছন পেছন প্ল্যাটফর্মের সামনের দিকে এগিয়ে গেল।
আমি আর একম গেলাম না।
একম বলল, "ভাই, কিছু খেয়েছিস? আমার তো ভীষণ খিদে পেয়েছে।"
আমি বললাম,"আমরা তো চা খেলাম ,তুই তো রুটি নিয়ে আসিস। আনিসনি আজকে?"
"ব্যাগে আছে। বাট এত ভিড়! বাবার দোকানেও ভিড় ছিল, খেতে পারিনি।"
এই সময়ই স্টেশনে গেদে লোকাল ঢুকছিল।
আমার মাথায় জানি না কী ভূত চাপল।
আমি বললাম,"চল তাহলে, এটা তো কালিনারায়ণপুর গিয়ে দাঁড়াবে। তাহলে ওইটুকু আমরা এটাতেই যাই। তারপর ওখানে বসে রুটি খেয়ে নিস। তারপর শান্তিপুর লোকাল ধরে বাড়ি।"
একমও আর কিছু ভাবল না।
পকেট থেকে ওর বাটন ফোনটা বের করে সুপ্রিয়কে বলল, "তাড়াতাড়ি এই ট্রেনে ওঠ!"
সুপ্রিয় বলতে যাচ্ছিল, "কেন?"
একম বলল, "আরে ভাই, ওঠ না!"
সামনে ট্রেন থাকায় ওরও মাথায় আর কাজ করল না।ওরাও ট্রেনে উঠে গেল।ট্রেনে মোটামুটি ভিড় ছিল।তবুও আমরা একটা স্টেশনের পরেই নামব বলে আর ভেতরে ঢুকিনি। গেটের কাছেই মুখোমুখি দাঁড়িয়ে ছিলাম।
হঠাৎ দেখি, একম চোখটা কেমন বড় বড় করে উঁকি-ঝুঁকি মেরে কী যেন দেখছে।
"কী?" আমি ওর চোখ অনুসরণ করে বললাম , ও কাঁপা কাঁপা গলায় বলল,"ওই স্ক্রিনে দেখ, কী লেখা?"
আমিও পড়ার চেষ্টা করলাম। "Next Station — Bankim..."
ঠিক তখনই একমের ফোনটা বেজে উঠল।
"কী রে ভাই! এই ট্রেনে উঠিয়েছিস কেন? গেদেতে কী করতে যাবি?"—সুপ্রিয় রীতিমতো ধমক দিয়ে লাগল।
একম চুপ।"সুপ্রিয় আবার বলল, "বঙ্কিমে নেমে যাস। তারপর তোদের হচ্ছে .."
কথাটা শেষ করার আগেই আমাদের ট্রেন থেমে গেল।ট্রেন থেকে নেমেই আমার পা কেমন থমথম করে উঠল।স্টেশনে ঘুটঘুটে অন্ধকার।আর একটা অস্বাভাবিক শান্ত ভাব চারিদিকে ছড়িয়ে আছে।হাতে গোনা কিছু লোক আমাদের সঙ্গেই ট্রেন থেকে নামল। স্টেশনের লাইটগুলো এখনও জ্বলছে না।
সায়ন ঘাবড়ে গিয়ে বলল,"কী রে ভাই, এ কোন জায়গায় চলে এলাম?"
সুপ্রিয় রেগে গিয়ে বলল,"এই ট্রেনে ওঠা কার বুদ্ধি ছিল, বল তো? ব্যাটা তোরা জানিস না গেদে লোকাল রানাঘাট থেকেই ভাগ হয় "
" কিন্তু আগের দিন যে আমরা গেলাম রে " — আমি আমতা আমতা করতে করতে বললাম
সুপ্রিয়ও প্রায় চেঁচিয়ে গাল দিয়ে বলল " ওটা লালগোলা ছিল রে শু............!"
ট্রেনটা আস্তে আস্তে বিন্দু হয়ে অনেকে দুরে মিলিয়ে যেতেই এই নির্জন প্লাটফর্ম এ সুপ্রিয়র চিৎকারটা কেমন অস্বাভাবিক লাগল .
আমি মনে মনে মেলাতে চেষ্টা করলাম রানাঘাট থেকে তাহলে চারটে লাইন ভাগ হয় শিয়ালদহ , বনগাঁ ,কালিনারায়ণপুর আর গেদে । তারপর কালিনারায়ণপুর থেকে আবার শান্তিপুর ,কৃষ্ণনগর,লালগোলা ।
এরকম পরিস্থিতিতে ঝামেলা করা ঠিক হবে না বুঝে একম বলল ,"এখন ওসব ভেবে লাভ নেই। কীভাবে ফিরব, সেটা ভাব।"
"পরের ট্রেনের জন্য অপেক্ষা করবি?"—সায়ন বলল।
পরের ট্রেন কখন, সেটা দেখার জন্য সুপ্রিয় ফোন খুলতেই ওর ফোন সুইচ অফ হয়ে গেল।
ঋতম বলল, "আমার মনে হয়, বঙ্কিমনগর থেকে কালিনারায়ণপুর টোটো করে যাওয়া যায়।"
এটা বলে ও স্টেশন থেকে নেমে একটা লোককে জিজ্ঞাসা করল,"কাকু, টোটো স্ট্যান্ডটা কোন দিকে, বলতে পারবেন?"
কাকু হাত দিয়ে সামনের দিকে ইশারা করতেই ঋতম আমাদের সামনের দিকে দৌড়ানোর ইশারা করল।সবাই ঋতমের পেছনে ছুটতে শুরু করলাম।আমার মাথায় তখন কোনও উপায় আসছে না।খালি একটাই জিনিস মনে পড়ছে—
"৯:৩৫-এ রানাঘাট থেকে ট্রেন। আর এখন বাজে ৯:২৩।"
টোটো স্ট্যান্ড বলতে আমরা যা বুঝি তার কিছুই না একটা মাত্র টোটো দাঁড়িয়ে আছে।
আমরা কাছে যেতে কাকুটা আমাদের অবস্থা হয়ত কিছুটা আন্দাজ করতে পেরেই নিজে থেকেই বলল "কোথায় যাবে?"
"কালিনারায়ণপুর।" ঋতম বলল ।
সায়ন যে ওই স্টেশন থেকেই কী বিড়বিড় করে মন্ত্র জপ করছে , ওই জানে আমাদের কারোর সেদিকে কান দেওয়ার সময় নেই।
সুপ্রিয়তো ব্যাপারটাকে মনেহয় এঞ্জয় করছে ,অন্তত ওর মুখ দেখে তো তাইই মনে হচ্ছে ।
কাকু বলল,"কয়জন?"
"পাঁচজন।"
"১৫০ টাকা লাগবে।"
১৫০ টাকা!
কথাটা শুনেই পকেটে হাত দিতেই মনে পড়ল—আজ তো মানিব্যাগটাই আনা হয়নি!
একম বলল,"তোদের কার কাছে কত টাকা আছে বের কর।"
আমি শুধু বললাম,"আজ মানিব্যাগটা আনা হয়নি।"
সুপ্রিয় বলল,"ইয়ার্কি মারছিস ? আমার কাছে যা ছিল, আমার সেই টাকা দিয়েই তো আমি তখন সবাইকে চা খাইয়ে দিয়েছি।"
ঋতম আর সায়নের কোনওদিনই এতটা টাকা থাকে না। যতটুকু টিকিট কাটতে প্রয়োজন, সেটুকুই ওরা মানিব্যাগে রাখে।সবাই এখন একমের দিকে তাকাল।
একম ওর মানিব্যাগ বের করে দেখল, সেখানে মাত্র ১০০ টাকা পড়ে আছে।
কাকুটার প্রায় পায়ে পড়তে বাকি রেখেছিল ঋতম ; সায়ন ওই দিকে মন্ত্রতে আরও ডুবে যাচ্ছিল ।
"কাকু, আমরা বেশ বিপদে পড়েছি। কালিনারায়ণপুর থেকে আমরা ট্রেন ধরব। ট্রেন হয়তো রানাঘাট ছেড়েও গিয়েছে। আমাদের কাছে ১০০ টাকা আছে। প্লিজ, নিয়ে চলুন।"
আমাদের আশেপাশের লোকগুলোও ওঁকে বলল,"নিয়ে যা। বাচ্চা ছেলে বিপদে পড়েছে, এত রাতে।" কাকুও রাজি হলেন।

"কাকু, আপনি যতটা শর্টকাট জানেন, আমাদের সেখান দিয়ে নিয়ে যান।"—টোটোতে উঠতে উঠতে একম বলল ।
সুপ্রিয় সামনে কাকুর পাশে বেশ আয়েশ করে বসতে বসতে বলল " আরে তা কেন ? এতো তাড়াহুড়ো কেন? বেশ থ্রিল লাগছে তো। "
ঠাট্টা করা তো দুরের কোথা । ঠাট্টা বোঝার মত ক্ষমতাও আমাদের তখন ছিলনা ।
সময় তখন ৯:৩০।
সকলে উঠে বসতেই উনি টোটো ছুটিয়ে দিলেন।
একম হিসেব করতে লাগল—ট্রেন এখন কোথায় থাকতে পারে, আমরা কতক্ষণের মধ্যে সেখানে পৌঁছালে ট্রেন পাব, ইত্যাদি।সকলে একমের হিসেব মন দিয়ে শুনছিলাম। সায়ন আর সুপ্রিয় বাদে । সায়ন এতক্ষণ গায়ত্রী মন্ত্র পাঠ করছিল এখন হনুমান চালিশা । কে জানে ছেলেটা আর কী কী মন্ত্র জানে !
দু'দিকে মাঠ, তার সঙ্গে অন্ধকার।একটা স্ট্রিট লাইটও নেই।চাঁদের আলোয় যতটুকু চারপাশ দেখা যাচ্ছে, ততটুকুই।
"কাকু, এখানে মার্ডার হয় নাকি?"
সুপ্রিয়র প্রশ্নে কাকু একটু বিস্মিত হয়েই জবাব দিলেন "না।"
"তাহলে আর তেমন ভয়ংকর জায়গা নয়।"—সুপ্রিয়র গলায় একটু হতাশার ভাব।
কাকু ওর কথা শুনে কি একটু হাসলেন নাকি রেগে গেলেন পিছন থেকে বুঝতে পারলাম না। কিছুক্ষণ পর কাকু টোটো থামালেন।বললেন,"চলে এসেছি।"
"কোন দিকে, কাকু?", চারিদিকে তাকিয়ে স্টেশনের হদিশ না পেয়ে আমি বললাম।
একটা ব্রিজ দেখিয়ে বললেন,"এটা পার করে ওপারে যাও।"আমরা সকলেই সেই ব্রিজের মধ্যে দিয়ে দৌড়াতে লাগলাম। আমাদের পায়ের নিচ দিয়ে চূর্ণী নদী বয়ে যাচ্ছে। চূর্ণীর জলে চাঁদের ছায়াটা কি আমাদের থেকেও জোরে দৌড়াচ্ছে?
ব্রিজ অসম্ভব কাঁপছে।
তার ওপর এদিকটা মনে হয় বৃষ্টি হওয়ায় কাদা হয়ে রয়েছে। হালকা পিচ্ছিলও।
হঠাৎ একম পিছলে গেল।সকলে থমকে গেলাম।সরু ব্রিজের দুটো দিক ধরে ও কোনওরকমভাবে দাঁড়াল।
তারপর আমাদের আবার দৌড় শুরু হল।আমি ঘড়ির দিকে তাকালাম।
স্টেশনের যেদিক থেকে হালকা আলো ওখানে আসছে, তাতে কটা বাজে তা দেখতে পারলাম না।
ব্রিজ পার করার পর রাস্তাটা দুটো দিকে ভাগ হয়ে যাচ্ছে।একম, ঋতম, সায়ন দৌড়াল ডান দিকে।সুপ্রিয় বাঁ দিকে।
আমি বিহ্বল হয়ে মাঝখানে দাঁড়িয়ে রইলাম।
একমকে ডাকলাম,"কোন দিকে যাব?"
একম বলল,"এদিকে আয়।"
আমি সুপ্রিয়কে বললাম, "ওদিকে নয়, এদিকে আয়।"
সুপ্রিয় দিক পরিবর্তন করে আমাদের সঙ্গে ছুটছে।
সবার যত শক্তি আছে শরীরে, তার থেকেও বেশি শক্তি দিয়ে ছুটছি।
সবার পিছনে আমি।
হঠাৎ দেখি, সুপ্রিয় একটা গাছের সামনে দাঁড়িয়ে গেল।
বাকিরা ওকে ফেলে রেখেই ছুটছে।
আমি একটু এগিয়ে যেতেই দেখলাম, ওই গাছের নিচে একটা শিবলিঙ্গে ও প্রণাম করছে।
ঠিক সেই শিবলিঙ্গের সামনে থাকা আলোতে তাকিয়ে দেখলাম—
**৯:৪২ বাজে।**
এখান থেকে স্টেশন দেখা যাচ্ছে।সুপ্রিয়কে বললাম চল ভাই।
"কেন ভক্তি কি একা সায়নই করতে পারে নাকি ?"— সুপ্রিয়ও চোখ বন্ধ রেখেই বলল !
বাকিরা স্টেশনে উঠে গেলাম।
স্টেশনে একটা চায়ের দোকান খোলা ছিল।
আমার আর সাহস হলনা জিজ্ঞাসা করার যে শান্তিপুর লোকাল বেরিয়ে গেছে নাকি এখনও আসেনি ।
ঋতম ওই দোকানের লোককে জিজ্ঞাসা করতেই উনি বললেন,"শান্তিপুরের খবর হয়ে গিয়েছে, এখুনি আসবে।"
সকলে হাঁফ ছেড়ে বাঁচলাম।কিন্তু তখনও সুপ্রিয় এসে পৌঁছায়নি।আমি বললাম,"ওকে একবার দেখে আসি।"
ঋতম বলল, "না থাক। এখন এত বিপদের মধ্যে ওর ভক্তি জেগে উঠেছে। ও না এলে ওকে ছাড়াই চলে যাব।"
এসব নিয়ে আমরা কথা বলতে বলতেই ও এসে হাজির হল।সকলেই ওর ওপর রেগে ছিলাম।কিন্তু ও বিষয়টাকে পাত্তা না দিয়ে বলল, "এখনও দাঁড়িয়ে আছিস? এই প্ল্যাটফর্মে ট্রেন দেবে না। ওদিকে চল, শান্তিপুর ১ নম্বরে দেবে।"
প্ল্যাটফর্ম চেঞ্জ করতেই দেখলাম, কিছু লোক স্টেশনে খিচুড়ি প্রসাদ দিচ্ছে। "খাবার!"
এই খাবারের জন্যই তো এত কষ্ট।সকলে একে অপরের মুখ চাওয়াচাওয়ি করলাম।তারপর সকলে প্রসাদ খেলাম।
খাওয়া শেষ হতেই ট্রেন ঢুকল।ট্রেনে উঠেই জানালার ধারের একটা সিট পেয়ে গেলাম।আমি চুপচাপ গিয়ে বসে পড়লাম।ওরা তিনজন দরজার ধারে দাঁড়িয়ে নিজেদের মধ্যে কী যেন গল্প করতে লাগল।
ট্রেনটা ধীরে ধীরে ছাড়ল।জানালার বাইরে অন্ধকার ছুটে যেতে লাগল।মাঝে মাঝে দু-একটা বাড়ির আলো, দূরের কোনও স্টেশনের আলো কিংবা গাছের ফাঁক দিয়ে ভেসে আসা মিটমিটে আলো—তারপর আবার সেই অন্ধকার।
হঠাৎ চোখটা আকাশের দিকে চলে গেল।চাঁদটা তখনও ঠিক আগের মতোই আকাশে ঝুলছে।সেই একই চাঁদ।
চূর্ণীর ঘাটে বসে যেটাকে আমার মন খারাপের সঙ্গী মনে হচ্ছিল, এখন সেটাকেই কেমন যেন অন্যরকম লাগছে।
মনে হল—চাঁদটার তো আর মন খারাপ নেই! ও তো জানেই না ৮ মে আমার রেজাল্ট। ও তো জানে না, আমি সারা বছর কতটা পড়েছি আর কতটা ফাঁকি দিয়েছি। ও জানে না, আজ সকাল থেকে একটা তারিখ কীভাবে আমার পুরো দিনটাকে বদলে দিয়েছে। হয়তো চাঁদের কাছে ৮ মে আর পাঁচটা দিনের মতোই একটা দিন।
আমার কাছে নয়।
জানালায় মাথাটা ঠেকিয়ে চুপ করে রইলাম।সকালের সেই মাথাব্যথা এখনও আছে।রেজাল্টের চিন্তাটাও আছে।
আগামী কুড়িটা দিন কীভাবে কাটবে, সেটাও জানি না।কিন্তু আশ্চর্যভাবে, এই মুহূর্তে আর ভয় লাগছিল না।
হয়তো আজকের রাতটাই আমাকে একটু শিখিয়ে দিল—
সবকিছু নিজের মতো করে না চললেও, শেষ মুহূর্তে কোথাও না কোথাও একটা টোটো পাওয়া যায়।
লেখা : অর্পন মজুমদার
একাদশ শ্রেণি, চাকদহ রামলাল অ্যাকাডেমি, নদিয়া
ছবি : আবির

