সবুজ মনের রসদ
Ichchhamoti Logo
মিনেসোটার ' Stolen Neighbours Quilt ' প্রোজেক্টে তৈরি হওয়া ক্যুইল্ট

একবার ভেবে দেখো, তুমি সকালে ঘুম থেকে উঠে দেখলে হাজার হাজার অস্ত্রধারী সরকারি পুলিশ তোমার পাড়ায় পাহারা দিচ্ছে। ঠিক এই ঘটনাই ঘটেছিল আমেরিকার মিনেসোটা রাজ্যে, ২০২৫ সালের শেষ দিকে এবং ২০২৬ সালের শুরুর দিকে। সেখানে 'অপারেশন মেট্রো সার্জ' নামের একটি বড় সরকারি অভিযানের কারণে সাধারণ মানুষ এক চরম বিপদের মুখে পড়েছিল।

সরকার সেখানকার অভিবাসী (যারা অন্য দেশ থেকে এসে এখানে বসবাস করছেন) এলাকাগুলোকে টার্গেট করে প্রায় ৩ থেকে ৪ হাজার পুলিশ পাঠায়। এর ফলে পুরো এলাকা জুড়ে এক ভয়াবহ পরিবেশ তৈরি হয়। বাবা-মায়ের কাছ থেকে সন্তানদের আলাদা করে ফেলা হয়। পরিবারগুলো এতটাই ভয় পেয়েছিল যে, তারা ঘর থেকে বের হওয়াও বন্ধ করে দেয়।

যাঁদের ওপর এই অভিযান চালানো হয়েছিল, তাঁরা বেশির ভাগই নিজেদের দেশের চরম গরিবী, মারামারি বা নানা বিপদের মুখে পড়ে ইকুয়েডর, মেক্সিকো এবং ভেনেজুয়েলার মতো দেশ থেকে পালিয়ে এসেছিলেন। তারা মিনেসোটাতে এসেছিলেন কেবল একটু শান্তিতে কাজ করতে, সন্তানদের স্কুলে পাঠাতে আর নিরাপদে বেঁচে থাকতে। কিন্তু আমেরিকার আইনি নিয়মকানুন অনেক ধীরগতির এবং জটিল হওয়ার কারণে, অনেকেই সঠিক কাগজপত্রের জন্য অপেক্ষা করার মাঝেই কোনো সরকারি পরিচয়পত্র ছাড়া বসবাস করতে বাধ্য হচ্ছিলেন।

এই আতঙ্কের দিনগুলোতে, মাত্র কয়েক মাসের মধ্যে পুলিশ প্রায় ৪,০০০ মানুষকে ধরে নিয়ে যায়।

অভিযান শুরু হতেই চোখের পলকে পরিবারগুলো ভেঙে টুকরো টুকরো হয়ে যায়। মিনেসোটাতে এত মানুষকে একসঙ্গে রাখার মতো জায়গা ছিল না। তাই ধরে নিয়ে যাওয়া হাজার হাজার প্রতিবেশীকে অন্যান্য স্টেটের দূর-দূরান্তের বড় বড় ডিটেনশন সেন্টারে (এক ধরণের বন্দিশালা বা জেলখানা) পাঠিয়ে দেওয়া হয়। চারদিকে বেড়া দিয়ে ঘেরা সেই জেলখানায় সপ্তাহের পর সপ্তাহ আটকে রেখে তাদের উকিল কিংবা পরিবারের সাথে যোগাযোগ করতে দেওয়া হয়নি। চরম ভয়ে আর নিরুপায় হয়ে অনেকেই বাধ্য হয়ে দেশে ফিরে যাওয়ার কাগজে সই করে দেন। এরপর তাঁদের আবার সেই নিজেদের দেশগুলোতেই ফেরত পাঠিয়ে দেওয়া হয়, যেখান থেকে তাঁরা একদিন প্রাণ বাঁচাতে পালিয়ে এসেছিলেন।

পরিস্থিতি আরও খারাপ হয়ে ওঠে ২০২৬ সালের জানুয়ারি মাসে, যখন সরকারি পুলিশরা এই অভিযান শান্তভাবে দাঁড়িয়ে দেখা দুজন সাধারণ মানুষকে গুলি করে মেরে ফেলে:

• রেনে গুড (Renée Good): নিজের গাড়ির ভেতরে থাকা অবস্থায় তাঁকে এক পুলিশ কর্মকর্তা গুলি করে মেরে ফেলেন।

• অ্যালেক্স প্রেটি (Alex Pretti): তিনি হাসপাতালের একজন নার্স ছিলেন। তিনি অভিযানের ভিডিও করার সময় এক নারীকে বাঁচাতে গিয়ে গুলিতে প্রাণ হারান।

আশেপাশের মানুষের মোবাইলে তোলা এই ঘটনার ভিডিওগুলো দ্রুত ইন্টারনেটে ছড়িয়ে পড়ে। সারা দেশের মানুষের মনে এতে অনেক রাগ ও দুঃখ তৈরি হয়। সারা বিশ্ব দেখতে পায় যে এটি কেবল কোনো রাজনীতির কথা নয়—এটি একটি বড় মানবিক কষ্ট, যেখানে নির্দোষ মানুষের জীবন কেড়ে নেওয়া হচ্ছে।

একজোট হওয়া সমাজ

ভয়ে লুকিয়ে না থেকে মিনেসোটার মানুষ এক হয়ে এর প্রতিবাদ করে। শহরের বড় বড় নেতারা সরকারি পুলিশকে তাদের কোনো বাড়ি বা অফিস ব্যবহার করতে দিতে মানা করে দেন। অন্যদিকে, সাধারণ প্রতিবেশীরা মোবাইলের গোপন গ্রুপ চ্যাটের মাধ্যমে একে অপরকে পুলিশের খবরাখবর দিয়ে সাবধানে রাখতে শুরু করেন। ভালোবাসার এক দারুন উদাহরণ তৈরি করে, ১ লক্ষ মানুষ মিনেসোটার রাস্তায় নেমে আসেন। 'No Work, No School, No Shopping' ( কাজ বন্ধ, স্কুল বন্ধ, বেচাকেনা বন্ধ) স্লোগান দিয়ে দোকানপাট ও স্কুল বন্ধ করে তাঁরা অভিবাসী প্রতিবেশীদের পাশে এসে দাঁড়ান।

কাপড়ের টুকরো দিয়ে স্মৃতি ধরে রাখা

অভিযানের প্রথম ধাক্কা কেটে যাওয়ার পরও গোপনে এই মানুষদের তাড়িয়ে দেওয়ার কাজ চলতে থাকে। সব মিলিয়ে এই অভিযানের শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত মিনেসোটা থেকে তাড়িয়ে দেওয়া মানুষের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে প্রায় ১১,০০০ এ।

ঘটে যাওয়া এই অন্যায় আর হারিয়ে যাওয়া হাজার হাজার জীবনকে মানুষ যাতে কোনোদিন ভুলে না যায়, সেজন্য সাধারণ মানুষ মিলে তৈরি করে একটি বিশেষ প্রজেক্ট। এর নাম ছিল 'মিনেসোটা স্টোলেন নেইবারস কুইল্ট প্রজেক্ট / MN Stolen Neighbors Quilt Project' (হারিয়ে যাওয়া প্রতিবেশীদের স্মারক কাঁথা)। দীর্ঘ ছয় মাস ধরে, ১৫০ জনেরও বেশি সাধারণ মানুষ এবং স্কুলের ছোটো ছোটো বাচ্চারা অনেক ভালোবাসা দিয়ে হাজার হাজার কাপড়ের টুকরো একসঙ্গে জোড়া দিয়ে (প্যাচওয়ার্ক করে) একটি বিশাল বড় ক্যুইল্ট বা কাঁথা তৈরি করেন। এই কাঁথার প্রতিটি ছোট কাপড়ের টুকরো ছিল ঘর থেকে হারিয়ে যাওয়া একেকজন অমূল্য প্রতিবেশীর প্রতীক। কাঁথাটি যখন শেষ হয়, তখন সেটির মাপ হয় ৯ ফিট চওড়া আর ৪২ ফিট লম্বা; আর মোট ১২,৫০০টি কাপড়ের টুকরো জুড়ে জুড়ে এটি তৈরি করা হয়। 

এই কর্মকান্ডের উদ্যোক্তা, আওয়েন লুবোজিন্সকি (Owen Lubozynski) ইচ্ছামতীকে ইমেইল মারফত জানিয়েছেন, 'Our initial goal was to include 11,000 squares, to represent the approximately 11,000 Minnesotans abducted by ICE from the beginning of President Trump's second term to the end of Operation Metro Surge, which was when we first conceived of the quilt. However, we received so many contributions that we ended up with 12,500 squares. Because the abductions were continuing throughout the making of the quilt, we decided to include all 12,500 squares. As of July (our most recent data), the total number of Minnesotans taken by ICE... was approximately 11,900. We fear the real data may have already caught up with the number of squares in the quilt -- or that it will soon.'

২০২৬ সালের ২২ সেপ্টেম্বর, মঙ্গলবার, এই বিশাল স্মারক কাঁথাটি মিনেসোটা স্টেট ক্যাপিটল (শহরের প্রধান সরকারি ভবন) ভবনের ভেতরে সবার সামনে আনা হয়। সেখানে আসা মানুষজন গভীর নীরবতার মধ্য দিয়ে কাঁথাটি উঁচিয়ে ধরেন এবং পরে ভবনের মার্বেলের সিঁড়ির ওপর মেলে ধরেন। এটি সারা বিশ্বকে দেখিয়ে দিল যে, শাসক যতই আমাদের আলাদা করার চেষ্টা করুক না কেন, সমাজের মানুষের মিল, দয়া আর ভালোবাসার শক্তিকে এত সহজে মুছে ফেলা যায় না।

কিছু তুলনামূলক তথ্য

• আমেরিকা যুক্তরাষ্ট্রের উত্তরে অবস্থিত মিনেসোটা রাজ্যের আয়তন কলকাতা শহরের তুলনায় ১১০০ গুণ বেশি। মানে মিনেসোটার ভিতরে প্রায় ১০০০টা কলকাতা শহর ঢুকে যেতে পারে।

• গুগল জানাচ্ছে, ২০২৬ সালে মিনেসোটায় মোটামুটি ৫,৮৯১,১০৯ (আটান্ন লক্ষ একানব্বই হাজার একশত নয়) জন মানুষ বসবাস করেন। আর কলকাতায়? আজকের দিনে বৃহত্তর কলকাতার আনুমানিক জনসংখ্যা প্রায় ১,৫৪,৪০,৬৭১ (এক কোটি চুয়ান্ন লক্ষ চল্লিশ হাজার ছয়শত একাত্তর)

• আয়তনের সঙ্গে জনসংখ্যার অনুপাত দেখলে, মিনেসোটা রাজ্যে প্রতি বর্গকিলোমিটারে মোটামুটি ২৮ জন মানুষ বাস করেন। আর কলকাতা শহরে প্রতি বর্গ কিলোমিটারে আনুমানিক ৮,২০০ জন মানুষ বাস করেন। তাই বোঝাই যায়, ঠিক কতজন মানুষ হারিয়ে গেছেন, তার হিসাব রাখা অনেকটাই সোজা।

• এই শহর, এই রাজ্য থেকে এমন কত মানুষ একই রকম কারণে হারিয়ে গেছেন। তোমার কি মনে হয়, তাঁদের কথা ভেবে, কলকাতা শহরেও এমন কোনো বিশাল কাঁথা বানানো সম্ভব?

আমরা, ভারতের জনগণ, ভারতকে একটি সার্বভৌম, সমাজতান্ত্রিক, ধর্মনিরপেক্ষ, গণতান্ত্রিক, সাধারণতন্ত্র রূপে গড়ে তুলতে সত্যনিষ্ঠার সঙ্গে শপথগ্রহণ করছি এবং তার সকল নাগরিক যাতে : সামাজিক, অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক ন্যায়বিচার; চিন্তা,মতপ্রকাশ, বিশ্বাস, ধর্ম এবং উপাসনার স্বাধীনতা; সামাজিক প্রতিষ্ঠা অর্জন ও সুযোগের সমতা প্রতিষ্ঠা করতে পারে এবং তাদের সকলের মধ্যে ব্যক্তি-সম্ভ্রম ও জাতীয় ঐক্য এবং সংহতি সুনিশ্চিত করে সৌভ্রাতৃত্ব গড়ে তুলতে; আমাদের গণপরিষদে, আজ,১৯৪৯ সালের ২৬ নভেম্বর, এতদ্দ্বারা এই সংবিধান গ্রহণ করছি, বিধিবদ্ধ করছি এবং নিজেদের অর্পণ করছি।

ফেসবুকে ইচ্ছামতীর বন্ধুরা