নতুন সূর্য আরও অনেক আলো ফেলুক তোমার পাতায়

ইচ্ছামতীর আঠারো বছর পূর্ণ হবে এ বছর। তার মানে ইচ্ছামতী খাতায়-কলমে সাবালক হবে; এটাই বলতে চাইছি কি? না না, ঠিক সেরকম ব্যাপার নয়। ওই সাবালক হওয়ার জন্য নির্দিষ্ট একটা বয়সকে বেছে নেওয়া ব্যাপারটারই আমি ঘোর বিরোধী l কানের কাছে ক্রমাগত “তুই সাবালক, তুই সাবালক” বলে বলে ভেতরে তরতরিয়ে বেড়ে ওঠা নাবালক ইচ্ছে সুখের পুচ্ছচ্ছেদনের বিপক্ষে আমি কিন্তু সারাজীবন বলেই যাব।
যাই হোক, ইচ্ছামতীকে নিয়ে লিখতে বসে বারবার বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘ইচ্ছামতী’ উপন্যাসটির কথা মনে পড়ে যাচ্ছে। কেন জানেন? কারণ আমাদের পরিচয় কিংবা প্রণয়ের পটভূমিটা বেশ কয়েক দশক জুড়ে বিস্তৃত। বিভূতিভূষণের সেই দীর্ঘদেহী নদীটির মতোই ইচ্ছামতী পত্রিকা আমার জীবনের গল্পটাকে নীরবে ছুঁয়ে রয়েছে তার সৃষ্টির আদিকাল থেকেই।
ব্যাপারটা একটু খুলেই বলি।
২০০৮ সালে দক্ষিণ কোরিয়ায় থাকাকালীন এই পত্রিকাটি হাতে আসে হঠাৎ করেই। আমি যেহেতু কোনোদিনই শিশুসাহিত্য, কিশোরসাহিত্য ইত্যাদি মলাট-লেখন নিরীক্ষণ করে বই পড়ি না, কিংবা ওই পাত্রীর চেয়ে পাত্রের বয়স অন্তত দু-চার বছর বেশি হতেই হবে ইত্যাদি কুপ্রথার নাগপাশমুক্ত স্বাধীন জীবনে অভ্যস্ত, ইচ্ছামতী পত্রিকাটি এককথায় বেশ দারুণ লাগে।
ইউনিভার্সিটি থেকে বাড়ি ফেরার পথে পাহাড়ের চড়াইটা পেরোতে রোজ কালঘাম ছুটে যেত, জানেন। সমতলে জন্ম যার, এসব বিপত্তিতে আপত্তি তো থাকবেই। কিন্তু ইচ্ছামতী হঠাৎ করে ব্যাপারটা বেশ সহজ করে দিল। হোস্টেলে আমার বিছানায় সন্ধ্যের অন্ধকারে নিজেকে কাঁধের ভারী ঝোলাটার মতো ঝপাং করে ছুঁড়ে দিয়ে প্রায় প্রতিদিনের প্রবাসে আমার ছায়াসঙ্গী তখন ইচ্ছামতী।
পরীক্ষার বিপুল চাপে ওই হেলথ ড্রিঙ্কের বিজ্ঞাপনের মতো ইচ্ছামতী সদা-সর্বদা আমার পাশে। মাঝে মাঝে কিছু কিছু লিখেও পাঠাতাম ইচ্ছামতীকে। অনেকটা ওই দিবে আর নিবে, মিলাবে মিলিবে এর মতো। জগতের আনন্দযজ্ঞে কে বুঝি আমাকেও নিমন্ত্রণ জানাচ্ছে। পত্রিকার সম্পাদিকা মহাশ্বেতার সঙ্গেও ই-মেইলে নানা কথা হতো সেই সময় থেকেই।
এর পর আমি তুরস্কে চলে গেলাম কয়েক বছরের জন্য। তখন কাজের চাপে লেখার সময় বের করতে পারতাম না ঠিকই, কিন্তু পড়তাম প্রায় প্রতিটি সংখ্যা।
এর মধ্যেই ২০১৪-তে ঘুঁটে-কুড়ুনির ঘরে একটা বাঁদরছানা এলো l নাম তার জেরি সলিটন। সেও মায়ের মতোই চেঙ্গিস। রাতে ঘুমোতে হয় আর দিনে জাগতে হয় এইসব সনাতন ধর্মাচারের ধার ধারে না মোটেওl
অগত্যা ঘুঁটে-কুড়ুনি মা আবার হাতে তুলে নেয় ইচ্ছামতী। সে সময় চুপিচুপি দরজায় রাত দুটোর সময় কান পাতলেও শোনা যেত 'পুরাণ কথা' কিংবা 'জানা-অজানা' গড়গড় করে পড়ে চলেছে মা, আর তার অতি ভব্য ছা সবেগে হাত-পা নেড়ে ব্যক্ত করছে মতামত।
গল্প, ছড়া, প্রবন্ধ শুনতে শুনতে আমার ছয় মাসের বাঁদরছানার সেই বেবাক হাসি আমায় তখন যারপরনাই উদ্বুদ্ধ করত পরের সংখ্যাটার জন্য অপেক্ষা করতে। এইভাবে কেটে গেল বেশ কটা বছর।
সম্পাদিকা মহাশ্বেতা ঠিক কবে, কী করে সলিটনের প্রিয় মাসিমণি হয়ে উঠল, সেটা এখন মনে করে বলা শক্ত। আমি বহুদিন অবশ্য ছানাকে মহাশ্বেতার কোনো ছবি দেখাইনি। কিছুটা কৌতূহলের বশে হয়তো। লেখার মধ্য দিয়ে মানুষটাকে কী করে আঁকে শিশুমন, জানতে চেয়েছিলাম বোধহয়।
এক সময় মায়ের মতোই পত্রিকা পড়ার পাশাপাশি লেখা আর আঁকা পাঠানো শুরু করল জেরি সলিটন।
শান্ত, বিপুলকায় ‘নদী ইচ্ছামতী’র মতো ‘পত্রিকা ইচ্ছামতী’ সুখদা, আবার বরদাও কি ?
কোভিডের সময় ইচ্ছামতী যেন আমাদের অনন্ত কারাগারের দুয়ারে অনেক অনেক কল্পনার পানসি ভাসিয়ে দিচ্ছিল। ছোটোদের ভোলানো অনেক সহজ, বড়োদের ভোলাতে কত যে কাঠ আর খড় পোড়ে!
আমি কিছুই ভুলি নি, ইচ্ছামতী। ঠিক যেমন তুমি ভোলোনি আমায়, তোমার আঠারো বছরের জন্মদিনে।
নতুন সূর্য আরও অনেক আলো ফেলুক তোমার পাতায়। আমরা ঠিক শিশির খুঁজে আনব তোমায় সাজাতে।
- বিস্তারিত
- লিখেছেন শর্মিষ্ঠা খাঁ
- বিভাগ: ইচ্ছামতী ১৮ । বিশেষ ক্রোড়পত্র । শুভেচ্ছাবার্তা
'ইচ্ছামতী'- পারিবারিক হাত পাকাবার প্রশ্রয়

'ইচ্ছামতী'র সঙ্গে আমার একটা আত্মিক বন্ধন রয়েছে। প্রথম সংখ্যায় লীলা মজুমদারকে নিয়ে ছোট্ট একটা লেখা লিখেছিলাম 'সত্যি আর স্বপ্নের লুকোচুরি'। তার ঠিক এক বছর আগে, সেপ্টেম্বর মাসেই ডক্টরেট গবেষণার জন্য নিবন্ধীকরণ করাই - যে গবেষণার অন্যতম মুখ্য শিশুসাহিত্যিক ছিলেন লীলা মজুমদার। সেভাবে দেখতে গেলে, ওটাই আমার গবেষণা শুরু করার পরে প্রথম প্রকাশিত লেখা। বন্ধু কল্লোল জানত আমার গবেষণার বিষয় এবং সেইই চাঁদের বুড়ি মহাশ্বেতাকে আমাদের সবার অত্যন্ত প্রিয় লেখককে নিয়ে কিছু লেখার জন্য আমার কথা বলে। ব্যস! সেই শুরু হল। সেই প্রথম সংখ্যাতেই 'মনের মানুষ' বিভাগে আমার লেখা ছিল আর 'ফিরে দেখা' বিভাগে আমার মেয়ের হবু বাবার লেখা ছিল। তারপরে মেয়ের জন্ম এবং একটু বড় হতে না হতেই ক্রমে ইচ্ছামতীর সঙ্গে পারিবারিক সংযোগ আরও দৃঢ় হয়ে উঠল। ২০০৮ সালের ২৭শে সেপ্টেম্বর ইচ্ছামতীর আত্মপ্রকাশ আর তার ঠিক এক বছর দুদিন পরে আমার আত্মজার ধরাধামে আগমন। আমার কন্যারত্নের প্রথম আঁকা ছবি, প্রথম লেখা গল্পের প্রয়াস, এমনকী প্রথম সিনেমার রিভিউ অবধি সবই তার হাত ধরে। বাংলায় হাত মকশো করার জন্য এত সুন্দর এক আবোল তাবোল মঞ্চ যেখানে লেখা আঁকার মধ্যে দিয়ে শিশু মনের কল্পনা জগত প্রসারিত হয়, সৃজনশীলতার উন্মেষ ঘটে , এমন একটা জায়গা পেয়ে সত্যিই যেন হাতে চাঁদ পেয়েছিলাম এবং সেকারণে আজও চাঁদের বুড়িকে আন্তরিক এবং অশেষ কৃতজ্ঞতা এবং ধন্যবাদ জানাই। একদম প্রথম দিকে, এবং পড়তে না পারলেও নিজেকে 'লেখক' ভাবতে পারার প্রথম গর্ব আর ভালোলাগাটুকু আমার শিশুকন্যাকে উপহার দিয়েছে 'ইচ্ছামতী'। মনে আছে প্রথম একটা উৎসবের ছবি বলে ফিঙ্গার পেইন্টিং করা একটা নানা রঙের সমাহার যেবার প্রকাশিত হয়েছিল তখন তার তিন বছর। তারপরে আরেকটা ছবি এঁকেছিল চাঁদিপুর বেড়াতে গিয়ে। সেই ছবির সঙ্গে যে গল্পটা বা ঘটনাটা ও বলেছিল সেটা আমি লিখে দিয়েছিলাম। ছবিটা ছিল নীল আর গাঢ় সবুজের মিলমিশ একটা অসমান পুঞ্জীভূত প্রায় বৃত্ত। ছবিটা সম্পর্কে বলেছিল - 'নীলটা সমুদ্র আর সবুজটা গাছপালা। সমুদ্রে বৃষ্টি পড়ছিল। গাছটা উড়ে এসে সমুদ্রে পড়ল। দুই ডানায় উড়ে উড়ে এল...কিন্তু গাছের কি ডানা থাকে? না, না...গাছটা ঝড়ে উড়ে এসে সমুদ্রে পড়ল - বৃষ্টির সঙ্গে ঝড়ও হচ্ছিল তো...এই ছবিটা আমি এঁকেছি।' এভাবেই শুরু, তারপর গল্প, ফিল্ম রিভিউ এসবও অগাধ স্নেহ আর প্রশ্রয়ে নিজের পাতায় স্থান দিয়েছে 'ইচ্ছামতী' আর সেসব রীতিমত পাঠকের বাহবাও কুড়িয়েছে! সে বাহবাও অনেকটা স্নেহের দান বটে কিন্তু আসল কথা হল একটি শিশু মনের সৃজনশীলতাকে এভাবে উৎসাহিত করে হাত পাকাতে দেওয়ার জায়গা যখন ক্রমে লুপ্ত প্রায়, সেখানে এইরকম যা ইচ্ছে তাই লিখে আর এঁকে কল্পনা আর বাস্তবের মিশেলে মনের ভাব প্রকাশ করতে দেওয়ার সুযোগ করে দেওয়ার জন্যই চাঁদের বুড়ির আভূমি কুর্নিশ প্রাপ্য।
আরও আছে। আজকের দিনে একক প্রচেষ্টায় বাংলায় এরকম একটি ওয়েব পত্রিকা আঠারো বছর ধরে চালিয়ে নিয়ে যাওয়া চাট্টিখানি কথা নাকি! মনে আছে, প্রথম প্রথম কেউ কেউ চাঁদের বুড়িকে নিরস্ত করার চেষ্টা করেছিল এই বলে যে এসব ঘরের খেয়ে বনের মোষ তাড়ানোর প্রচেষ্টার কোন মানে হয় না এবং এটা কতদিন চালাতে পারবে ও? সেই উত্তর আজ আলাদা করে দেওয়ার দরকার নেই। মাঝে মাঝে একটু বিরতি, একটু অনিয়মিত হয়েছে হয়ত নানাবিধ কারণে কিন্তু হাল ছেড়ে দেয়নি সে। যখন চাঁদের বুড়ি আমাকে ব্যক্তিগত কথোপকথনে জানিয়েছিল সেই সব নেতিবাচক কথাবার্তা, আমি একদম নিজের স্বার্থেই বলেছিলাম ও যেন লেগে থাকে। 'ইচ্ছামতী' যেন বয়ে চলে আপন গতিতে। কারণ, আমার মত একজন অভিভাবক মাত্রেই জানবে তাঁর ইংরিজি মাধ্যমে পড়াশুনো করা, শিশুর জন্য, বিশেষত সহপাঠীদের মধ্যে স্কুল পাঠ্যের বাইরে বাংলা বই পড়া, লেখা এসবের সেভাবে প্রচলন না থাকা পরিস্থিতিতে,বাংলায় ভাবা, এবং লেখা অভ্যাসের জন্য এমন একটা মঞ্চের মূল্য ঠিক কতটা! যদিও সম্পাদকের মতে, কতজনকেই তো উনি বলেছিলেন বাচ্চার আঁকা লেখা দেওয়ার জন্য, কিন্তু বাচ্চাকে দিয়ে আঁকিয়ে লিখিয়ে উৎসাহ দিয়ে , নিজে বাংলায় টাইপ করে দপ্তরে পাঠিয়ে দেওয়ার কাজটুকু আমার মত কতিপয় অভিভাবকই করে থাকেন কাজেই ঋণ ইত্যাদি ওসব উভয়ত! কিন্তু আমি জানি যে আমার কাছে , আমার মেয়ের জন্য 'ইচ্ছামতী' ঠিক কতটা সদর্থক ভূমিকা পালন করেছে! এখন তিনি বড় হয়েছেন, ব্যস্ত হয়েছেন, আগামী বছর তিনিও প্রাপ্তবয়স্ক হবেন, বড়ই ব্যস্ত স্কুলের হাজারো পড়াশুনো এবং অন্যান্য সৃজনশীল এবং প্রশাসনিক কাজকর্ম নিয়ে। সময় পান না । কিন্তু এখনোও পুরোনো লেখা দেখলে আগের মতোই ছোট হয়ে যান। আনন্দ পান।
এতো গেল মেয়ের কথা। আমি নিজেও লেখক হিসেবে এখানে হাত খুলে লেখার অবাধ স্বাধীনতা পেয়েছি। ছোটদের মনোজগত বরাবরই আমাকে আলাদা আকর্ষণ করে, তাদের সঙ্গে সময় কাটাতে, গল্প করতে, তাদের জন্য লিখতে আলাদা সুখ , আলাদা শান্তি। এটা চাঁদের বুড়ি খুব ভালোভাবে জানে। তাই ঠিক লিখিয়ে নেয় সময়মতো। বিভিন্ন ধরণের লেখা লিখেছি এখানে। প্রবন্ধ, গল্প, ভ্রমণ বৃত্তান্ত এমনকি মেয়ের নানা কীর্তি নিয়ে 'কুটুস' বলে একটি কমিকস ধারাবাহিক অবধি! দুর্ভাগ্যবশত গ্রাফিক্স এর শিল্পী ও অন্যান্য কিছু জটিলতার কারণে কয়েকটি পর্ব প্রকাশের পরে আর এটি চালানো যায়নি কিন্তু আমি মেয়ের ছোটবেলার নানা মজাদার কাহিনী এই সুযোগে ছোট ছোট করে লিখে ফেলেছিলাম। ফিরে তাকালেই মন কেমনের ভালোলাগায় ঠোঁটের কোণে মুচকি হাসি অবধারিত ভাবে এসে পড়ে।
আবার 'ইচ্ছামতী'র দশ বছরের ভরসা পূর্তিতে একই সংখ্যায় পরিবারের তিনজনেই ঠাঁই পেয়েছিলাম । সেও তো এক অমূল্য অনাস্বাদিত মজার অনুভূতি ! কখনো মা মেয়ে দুজনেরই লেখা বেরিয়েছে একসঙ্গে! বড্ড দুষ্প্রাপ্য এবং দুর্লভ সেসব মুহূর্ত আমার কাছে। পাঠক হিসেবে আরও অন্যান্য পারিবারিক পত্রিকা কিছু আছে হয়ত, কিন্তু 'ইচ্ছামতী' আমাদের সেই একমাত্র পারিবারিক বাংলা ওয়েব পত্রিকা যা কিনা আমাদের তিনজনেরই লেখক -শিল্পী সত্ত্বাকে সম্মান জানিয়েছে, কখনো আলাদা ভাবে কখনো বা একই সংখ্যায়! আমাদের লেখাগুলো ফিরে দেখতে বা নতুন করে পড়তে ইচ্ছে করলে আমার নাম মৌপিয়া, মেয়ের নাম মরমিয়া, কুটুস আর মেয়ের বাবার নাম শঙ্খ দিয়ে 'ইচ্ছামতী'তে অনুসন্ধান করলে পেয়ে যাবেন। সম্ভব হলে জানাবেন কেমন লাগলো। খুব ভালো লাগবে এবং কৃতজ্ঞ থাকব। আগাম ধন্যবাদ জানিয়ে রাখলাম। আসলে এই লেখাটা লেখার জন্য আমিও ফিরে ফিরে দেখছি পুরোনো পাতাগুলো আর কত যে স্মৃতি সব ভীড় করে আসছে! অদ্ভূত ভালোলাগায় মন ভরে যাচ্ছে। ২০১৫ সালে মেয়ের চোখের কোণে বড় একটা ফোঁড়া অস্ত্রোপচার করতে হল। কিন্তু তার পরের দিন যখন ইচ্ছামতীর পাতায় নিজের আঁকা লেখা দেখলো…তখন সেই সদ্য ছ'য়ে পা দেওয়া বালিকার মুখে যে স্বর্গীয় অনাবিল হাসি ফুটে উঠেছিল তার মূল্য কীভাবে পরিমাপ করব? আগামী ২৯শে সেপ্টেম্বর সেই মেয়ে সতেরোয় পা দেবে । আর তার দু'দিন আগেই 'ইচ্ছামতী' তথাকথিত প্রাপ্তবয়স্ক হবে। এই আঠারোর জন্মদিনে, 'ইচ্ছামতী'র জন্য মেয়ের মুখের সব ব্যথা উপশম করে দেওয়া সেই হাসিটাই উপহার হিসেবে রইল আমাদের মা মেয়ের তরফ থেকে। আন্তরিক অভিনন্দন এবং শুভেচ্ছা সহ ধন্যবাদ চাঁদের বুড়িকে। ভালো থেকো তোমরা। আরও আঠারো আসুক। জন্মদিনের আন্তরিক অভিনন্দন এবং শুভেচ্ছা 'ইচ্ছামতী'।
- বিস্তারিত
- লিখেছেন মৌপিয়া
- বিভাগ: ইচ্ছামতী ১৮ । বিশেষ ক্রোড়পত্র । শুভেচ্ছাবার্তা
ইচ্ছামতীকে শুভেচ্ছা জানাই

- বিস্তারিত
- লিখেছেন নিধু সর্দার
- বিভাগ: ইচ্ছামতী ১৮ । বিশেষ ক্রোড়পত্র । শুভেচ্ছাবার্তা
ইচ্ছামতীর জন্মদিনে

প্রিয়,
চাঁদের বুড়ি,
শরতের মেঘের মতো এক পশলা চিঠি যখন আমার উত্তরপাড়ার চিলেকোঠায় এসে পৌঁছালো তখন আমার মনে পড়লো ইচ্ছামতী নদীকে। মনে পড়লো তার ওপরে পাল তোলা নৌকাটাকে। আর সেই আলো ঝলমল সকালটা যেখানে মেঘের ভেলায় গোটা বিশ্বের মাঝে হামা দিতে শিখেছিল আমাদের ইচ্ছামতী ওয়েব ম্যাগাজিন। আজ তার বয়েস আঠারো। স্পর্ধায়, সাহসিকতায় এই বয়েস তো মাথা নোয়াবার নয়। আর কি আশ্চর্য সমাপতন এই বছরেই আমাদের কিশোর কবি সুকান্ত ভট্টাচার্যের জন্মশতবর্ষ। যিনি লিখেছিলেন ‘এদেশের বুকে আঠারো আসুক নেমে’।
তোমার কি মনে আছে চাঁদের বুড়ি আমরা যখন সেই ছোট্ট ইচ্ছামতীকে নিয়ে বয়ে চলতে শুরু করলাম নিজস্ব এক ছন্দে তখনও তো আমরা নিজেদের স্বাধীন চিন্তার পরিসর থেকে সরে আসিনি। আজও যখন দেখি দেশের বিপদে খুব সংকটকালে এই দেশের তরুণরা শিরদাঁড়া সোজা করে উঠে দাঁড়াচ্ছেন, তাঁদের মতবাদ, প্রতিবাদ ব্যক্ত করছেন তখন কেন যেন কবেকার এক হারিয়ে যাওয়া কবি তার সদ্য কৈশোরের ভাবুক মুখ নিয়ে গালে হাত দিয়ে আমাদের সামনে চুপটি করে বসে থাকেন। তখন একটা কবিতা, গল্প বা প্রবন্ধ শুধু তারমধ্যেই আটকে থাকে না। সেটা তার শব্দের, তার অর্থের, যাপনের ডালপালা নিয়ে প্রসারিত হয়ে যায় মানব সভ্যতার দিকে। তার কল্যাণের পথে। যে পথে আমরা হেঁটে এসেছি কত বহুবছর ধরে।
এখন যখন অনেকটা পথ পেরিয়ে এসে ফিরে তাকাই তখন মনে হয় এই যে আমরা সারাক্ষণ বলে থাকি আসলে ছোটরা ছোটই। তাদের পৃথিবী অন্যরকম। কাজেই তাদের পৃথিবী সাজাতে গিয়ে বড়োরা এবং আমার মতো বুড়োরা ভুলেই যাই তাদের কোনোদিন একটা ছোট্টবেলা ছিল। সেই ছোট্টবেলায় দূরে কাদের ছাদের ওপরে ছোট্ট মেয়ে রোদ্দুরে দিত বেগনী রঙের শাড়ি। তিনটে শালিক কুটোপাটি করে ঝগড়া করতো। ভক্তরামের নৌকা শক্ত কাঠের তক্তা দিয়ে তৈরী হতো। একটা দাঁড় কাক বেজায় গম্ভীর হয়ে স্লেটে বসে বসে অঙ্ক কষতো। আর পদিপিসির বর্মিবাক্সের গল্প শুনতে বসতো ঘুমে ঢুলু ঢুলু চোখ। এইসব কিছু ভুলে গিয়ে আমরা গম্ভীর হয়ে যাই। সিলেবাস সাজাতে গিয়ে কি কান্ডটাই না করি। আর সেইসব করতে গিয়ে ছোটদের জন্য লেখা, তাদের নিয়ে ভাবা, তাদের সঙ্গে সময় কাটানো এইটা যেন আমাদের কাছে মস্ত ফাঁকি হয়ে দাঁড়ায়। সমাজ আরও মজার জিনিস করে তখন। ছোটদের জন্য লিখলে তাকে এমন ভাবে দাগিয়ে দেওয়া হয় যেন তিনি এই সমাজের এক বিচ্ছিন্ন দ্বীপ। কই একটা বাড়িতে সবাই মিলে একসঙ্গে থাকলেও আলাদা করে মনে করিয়ে দিতে হয় না ছোটরা আলাদা মানুষ ঠিক তেমনই বারবার কোথাও মনে করিয়ে দেওয়ার আজ আর দরকার নেই এটা শুধুমাত্র ছোটদের জন্য লেখা বা আঁকা বা ছোটদের জন্য নির্মিত ছবি।
কেন আজ ইচ্ছামতীর এই বয়ে চলার আঠারো বছর বয়সে এই কথাগুলো বারবার মনে হচ্ছে বলো দেখি চাঁদের বুড়ি? কারণ আমার মনে হয় একটা মানুষের তার নিজের ছোটবেলার মনটাকে বাঁচিয়ে রাখাটা খুব দরকার। বিশেষ করে আজকের পৃথিবীতে। যে মন পরশ পেয়েছিল আদরের, আলিঙ্গনের, সবার স্নেহ-ছায়ার। সেই ছায়াটা বেঁচে না থাকলে কী করে আবার সেই মন অন্যকে আলিঙ্গন করবে? ভালোবাসবে? আজ পৃথিবীতে সেই সরল মনটার খুব দরকার। ঠিক ইচ্ছামতীর টলটলে জলের মতোই।
আমার অনেক ভালোবাসা, শুভকামনা থাকলো সেই মনগুলোর প্রতি, সেই মানুষগুলোর জন্য যারা এখনও নিজেদের ছোটভাবে, যারা এখনও অবাক চোখে বিস্ময়ে অভিভূত হয়ে পৃথিবীকে দেখে। তার কাছ থেকে অনেক কিছু শেখে।
আর তোমার জন্য চাঁদের বুড়ি রইলো একরাশ রক্তকরবীর মুগ্ধতা। কাঠি লজেন্সের ভালোবাসা। লুকিয়ে তেঁতুলের আচার খাওয়ার আনন্দ। ইচ্ছামতী তার রঙীন পাল তুলে এগিয়ে চলুক। সবার মন রাঙিয়ে রাখো ঠিক আগের মতোই। বৃষ্টির দিনে গরম ধোঁওয়া ওঠা খিচুড়ির ঘ্রাণের মতো লেগে থাকুক প্রাণের পরম তৃপ্তি। আর চরাচর ব্যপ্ত হোক এই শরতের আলোয়, মানুষের কল্যাণে।
সবাই ভালো থেকো।
কল্লোল।
উত্তরপাড়া খেয়াঘাট, ২২ সেপ্টেম্বর।
- বিস্তারিত
- লিখেছেন কল্লোল লাহিড়ী
- বিভাগ: ইচ্ছামতী ১৮ । বিশেষ ক্রোড়পত্র । শুভেচ্ছাবার্তা


