খেলাঘরখেলাঘর

কাঠের ঘোড়া

উড়তে উড়তে একসময় রাজপুত্রের খুব খিদে পেলো। সে দেখলো সে এক অচেনা শহরের ওপর দিয়ে উড়ে যাচ্ছে। সে একে একে সব স্ক্রু এঁটে ঘোড়ার গতি কমিয়ে আসতে আসতে নেমে পড়ল সেই শহরে। কাছেই ছিল এক সরাইখানা। সেইখানে আশ্রয় নিল। খাওয়া দাওয়া সেরে রাত্রে শুয়ে শুয়ে সে ভাবছিল এমনি করে কাঠের ঘোড়ায় চড়ে উড়ে বেড়ানোর মতো মজাই আলাদা। চোখের পলকে যেখানে খুশি যাও। নতুন নতুন শহর দেখো। এত খুশি জীবনে সে কোনদিন হয়নি।

পরদিন সে হেঁটে হেঁটে শহরে ঘুরতে বেরলো। কিছুদূর যাওয়ার পর দেখল সামনেই একটা বিশাল মাঠ। সেখানে অনেক লোক এসে ভীড় করে দাঁড়িয়ে আছে। সবাই আকাশের দিকে তাকিয়ে কিছু একটা দেখছে। রাজপুত্র ভাবলো আকাশে নিশ্চয় দারুন কিছু একটা দৃশ্য দেখা যাচ্ছে। সে ঐ ভীড়ের মধ্যে ঠেলে ঠুলে ঢুকে আকাশের দিকে তাকালো। কই কিচ্ছু তো নেই।

সে পাশের লোককে জিগ্যেস করল - কি দেখছ ভাই?

লোকটা অবাক হয়ে ওর দিকে তাকাল। বলল - আমাদের দেশের রাজার একটি মাত্র কন্যা। রাজকন্যা অলকানন্দার মতো পরমা সুন্দরী এই দুনিয়ায় আর একটিও নেই। রাজা তাকে খুব ভালোবাসেন। রাজকন্যার যাতে কেউ কোনো ক্ষতি করতে না পারে তাই তিনি আকাশের মধ্যে একটা অট্টালিকা তৈরী করে সেখানে রাজকন্যাকে রেখে দিয়েছেন। প্রতিদিন রাজসভার কাজ শেষ হলে রাজা সেই অট্টালিকায় গিয়ে রাজকন্যাকে দেখে আসেন। আজও উনি গেছেন। আর কিছুক্ষনের মধ্যেই ফিরে আসবেন। তাই সবাই ওনার ফেরার অপেক্ষায় এখানে দাঁড়িয়ে আছে।

রাজপুত্রের এই গল্প খুব অবিশ্বাস্য লাগল। বলল

-আকাশে আবার অট্টালিকা বানানো যায় নাকি? কোন মানুষ এমন অট্টালিকা বানিয়েছে বলে তো কোনদিন শুনিনি।

-মানুষ নয়, এক দেবতা রাজাকে বানিয়ে দিয়েছেন ঐ অট্টালিকা। সেই দেবতার দেওয়া রথে চড়েই রাজা সেই অট্টালিকায় যাতায়াত করেন।


এ খবর শুনে রাজপুত্র খুব উৎসাহিত হয়ে পড়ল। সে তখনই সরাইখানায় ফিরে গিয়ে তার কাঠের ঘোড়ায় চড়ে বসল। তারপর একটা একটা করে স্ক্রু আলগা করে আকাশে উড়ে গেল। আকাশে উড়ে উড়ে খুঁজে বেড়াতে লাগল সেই অট্টালিকা। কিছুক্ষনের মধ্যেই সে দেখতে পেল মেঘের মধ্যে এক অসাধারন সুন্দর অট্টালিকা ‘মেঘ-মঞ্জিল’। রাজপুত্র সোজা গেট দিয়ে উড়ে ঢুকে গেল ভেতরে। তারপর সব স্ক্রু এঁটে ঘোড়া থামিয়ে নেমে পড়ল।


রাজা তখন অট্টালিকা থেকে সবে বিদায় নিয়েছেন। রাজকন্যা অলকানন্দা বিশ্রাম নিচ্ছিল। হঠাৎ রাজপুত্র দিগ্বিজয়কে দেখে সে খুব অবাক হয়ে গেল। এত সুপুরুষ কোন মানুষকে সে আগে দেখে নি। ভাবল বুঝি কোন দেবতা এসেছেন। রাজপুত্র ভাবলো এমন সুন্দরী রাজকন্যা সত্যিই দুনিয়ার আর কোথাও মিলবে না। প্রথম দেখাতেই তারা দুজনে দুজনকে ভালোবেসে ফেলল। রাজকন্যা কাছে এসে রাজপুত্রকে অভ্যর্থনা জানালো। রাজপুত্র তার পরিচয় দিতে সে তার হাত ধরে ঘরে নিয়ে গেল। বসতে দিল, খেতে দিল। তারপর সারা রাত অনেক গল্প করল দুজনে।

পরদিন সকালে রাজপুত্র কাঠের ঘোড়ায় চরে তার সরাইখানায় ফিরে গেল। এপাশে সভা শেষ হলে বিকেলের দিকে রাজা এলেন রাজকন্যাকে দেখতে। অন্য সব দিন রাজকন্যা খুব গম্ভীর হয়ে থাকে। কিন্তু আজ তাকে খুব হাসি খুশি দেখাল। গুন গুন করে গান গাইছে। রাজার কেমন সন্দেহ হল। রোজ রাজা এসে রাজকন্যার ওজন মাপেন। রোজই একই থাকে। কিন্তু আজ ওজন এক কেজি বেশি হল। দেবতার তৈরী এই অট্টালিকায় কারো ওজন বাড়ে না। একমাত্র রাজকন্যা অন্য কোন মানুষকে ছুঁয়ে থাকলে তবেই তার ওজন বাড়বে। রাজা নিশ্চিত হলেন যে কেউ এখানে এসেছিল। রাজার অনুমতি ছাড়া এখানে কেউ কি ভাবে আসতে পারে ভেবে পেলেন না। রাজকন্যার সঙ্গে বেশি কথা না বলে তাড়াতড়ি নিজের প্রাসাদে ফিরে গেলেন।

এত তাড়াতাড়ি রাজাকে ফিরে আসতে দেখে সভাসদরা খুব অবাক হল। এপাশে রাজার মুখও খুব গম্ভীর। নিশ্চয় কিছু একটা ঘটনা ঘটেছে। রাজাকে জিগ্যেস করতে রাজা সব কথা খুলে বললেন।

-আমি ছাড়া কোনো একজন রাজকন্যার প্রাসাদে গিয়েছিল। তাকে ধরার ব্যবস্থা করতে হবে।

একজন সভাসদ বললেন

-আপনি দেশের সেরা যোদ্ধাদের মধ্যে চারজনকে বেছে নিয়ে রাজকন্যার অট্টালিকার চারকোনে দাঁড় করিয়ে রাখুন। তারাই রাজকন্যাকে পাহারা দেবে। কেউ এলে তাকে তৎক্ষনাৎ গ্রেপ্তার করবে।

রাজার মনে ধরল কথাটা। সে চারজন যোদ্ধাকে নিয়ে গেল অট্টালিকায়। তাদেরকে কি কি করতে সব বুঝিয়ে দিয়ে ফিরে এলো ।

কিন্তু কোন লাভ হল না। যোদ্ধারা আর কতক্ষন একটানা জেগে থাকবে? এক সময় তার চারজনেই ঘুমিয়ে পড়ল। তখন রাজপুত্র রাজকন্যার অট্টালিকায় গেলো। রোজকার মতো তার সঙ্গে দেখা করে, গল্প করে ভোরের বেলা ফিরে এলো সরাইখানায়।

রাজা পরদিন এসে রাজকন্যাকে আগের দিনের থেকেও বেশি হাসি খুশি দেখলেন। ওজন মেপে দেখলেন আগের দিনের থেকে আরো এক কেজি বেশি। বুঝতে পারলেন সেই আগন্তুক আগের রাত্রেও এসেছিল। রাজা রেগে আগুন হয়ে গেলেন। নিজের প্রাসাদে ফিরে গিয়ে তার সভাসদদের সঙ্গে জরুরী আলোচনায় বসলেন।

এক সভাসদ বললেন - রাজকন্যার বিছানায় আর চেয়ারে নতুন এক পোচ রঙ লাগিয়ে দেওয়া হোক। যে এসে বসবে ওখানে, তারই জামাকাপড়ে রং লেগে যাবে। তারপর আমরা সারা রাজ্য তল্লাশি করে দেখব কার পোশাকে ঐ রং লেগে আছে।

রাজার মনে ধরল কথাটা। সেই মত কাজও হল।

সেদিন রাত্রে রাজপুত্র গিয়ে রাজকন্যার সঙ্গে গল্প করে যখন ফিরিছিল তখন দেখল তার গায়ে বিশ্রী রং লেগে রয়েছে। সে রং লাগা জামাকাপড় খুলে ওপর থেকে ছুঁড়ে ফেলে দিল নিচে। এ পাশে হয়েছে কি সেই সময় এক বুড়ো লোক নীচে রাস্তা দিয়ে হেঁটে যাচ্ছিল। সে রোজ ভোরবেলা বাড়ি বাড়ি গিয়ে লোকদের ঘুম থেকে ডেকে দিয়ে প্রার্থনায় বসতে বলে। হঠাৎ আকাশ থেকে জামাকাপড় পড়তে দেখে সে খুব অবাক হয়। খুব ভাল জামাকাপড়, শুধু একটু রং লাগা। ভগবানের-র আশীর্বাদ ভেবে সে খুশি মনে সেই জামাকাপড় নিয়ে গিয়ে বাড়িতে রেখে দিল।